Sunday, 13 December 2020

ইউরোপীয় ধ্রুপদী সংগীতের কাহিনীঃ দ্বিতীয় পর্ব

 দ্বিতীয় পর্ব


বৈপ্লবিক কিছু না হলে প্রায় কোনো যুগান্তরই একদিনের নোটিশে হয় না। ইউরোপের সংগীতে রেনেসাঁ যুগের শেষ থেকে যে পরিবর্তনের ঝোঁকটা দেখা যাচ্ছিল, মোটামুটি ১৬০০ খ্রীষ্টাব্দ নাগাদ সেটা ডালপালা মেলতে শুরু করে। এই সময় থেকে একেবারে রোমান্টিক যুগের শেষ অবধি, মানে ১৯১০ নাগাদ, পর্বকে একসঙ্গে আবার বলে কমন প্র‍্যাকটিস পিরিয়ড। এসময় থেকেই একটা নির্দিষ্ট সিগনেচার কি (এর বাংলা জানি না) ব্যবহার করে পুরো সুর বানানো শুরু হয়৷ এই কমন প্র‍্যাকটিস পর্বের একদম শুরুটা হয়েছিল বারোক আমলে। আপাতত আমাদের গল্প চলবে বারোক যুগের মধ্যে দিয়ে। বারোক (baroque) নামটা এসেছে পর্তুগীজ barroco থেকে। যার অর্থ তেবড়ে যাওয়া মুক্তো। খোঁজ নিয়ে দেখতে পারেন এই বিকৃত মুক্তোর বাজারমূল্য নাকি অনেক৷ লম্বাটে, মুদ্রার মতো বিভিন্নরকম আকৃতির মুক্তোর নামেই গোটা একটা শিল্প আন্দোলনের নাম হয়ে গেছে। আর অলঙ্কার থেকেই যে যুগের নাম, সেযুগের শিল্পে আলঙ্কারিক আতিশয্য না থেকে যায় না। 

কিন্তু বারোক যুগের সংগীত নিয়ে লিখতে গেলে আগে তার চারপাশের শিল্প নিয়ে একটু লিখতে হয়। আগের পর্বে লিখেছিলাম কদিন আগেই মার্টিন লুথার কিং এর নেতৃত্বে প্রোটেস্টান্ট আন্দোলন শুরু হয়েছে। প্রোটেস্টান্টদের মূল বক্তব্যই ছিল ধর্মজীবনে সরলতা। ক্যাথলিকদের প্রাসাদোপম চার্চ, আতিশয্যপূর্ণ উদযাপনের বিপরীতে প্রোটেস্টানদের ধর্মচর্চা ছিল অনেকখানিই সহজ ও সাশ্রয়ী। এতে  খ্রীষ্টানরা দলে দলে প্রোটেস্টান মত গ্রহণ করছিল। বিষয়টা ক্যাথলিক চার্চের নজরে আসায় একটা বিপরীতমুখী আন্দোলন শুরু হয়। অর্থাৎ চার্চ, বাইবেল ও ঈশ্বরের সেই প্রাচীন গুরুগাম্ভীর্যের প্রচার ও প্রসার৷ লোকে বিস্মিত হতভম্ব করে বিরাট কিছুর সামনে চুপ করিয়ে দেওয়ার একটা দরকার ছিল। তাই এলো বারোক। একটা তুলনা দেওয়া যাক। আমাদের বাংলায় উনিশ শতকের নবজাগরণে হিন্দুধর্মের সংস্কার করে, ক্ষীরটুকু তুলে প্রোটেস্টান্টদের মতোই রাজা রামমোহন ঠাকুরবাড়ির সাহায্যে ব্রাহ্মধর্ম প্রতিষ্ঠা করলেন। আবার স্বামী বিবেকানন্দ ও অন্যান্যদের দ্বারা তার বিপরীতে ভক্তিবাদী ও বেদান্তবাদী ধর্মসংস্কার শুরু হল। যদিও পাশ্চাত্যের নিরিখে প্রাচ্যের রকমসকম বোঝানো উচিৎ না। কিন্তু পাঠক অনেকটা এইভাবে বিষয়টা বুঝতে পারেন। 

অর্থাৎ স্থাপত্য, অঙ্কন, ভাস্কর্য ও সর্বোপরি সংগীতে একটা জমকালো পরিবর্তন হল। আরেকটা খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, সময়টা ১৬০০ এর শেষ ও ১৭০০ এর গোড়া। এই সময় গ্যালিলিও দূরবীনে চাঁদের গর্ত, বৃহস্পতির উপগ্রহ, শনির বলয় দেখে ফেলেছেন। পৃথিবী ঘুরছে ঘোষণা হয়ে গেছে। ১৬৪২ সালে গ্যালিলিও মারা গেলেও সেই বছর জন্মগ্রহণ করেন আইজ্যাক নিউটন। পদার্থবিজ্ঞানে সাংঘাতিক সব পরিবর্তন হয়ে গেছে। লিবনিজ প্রমুখ গণিতবীদরা কাজ করছেন। ল্যাটিন ভাষার পরিবর্তে শিক্ষাক্ষেত্রে স্থানীয় ভাষার ব্যবহার বাড়ছে। একাধিক নতুন দেশ-দ্বীপ আবিষ্কার হয়েছে। আমেরিকাতে কলোনি বসে গেছে। মানুষ বুঝেছে পৃথিবীকে তাঁরা যতটা বড় ভাবতেন আসলে তারচেয়েও বড়। মহাকাশ আরো বড়। একটা বিশাল উঁচু ছাদের গির্জার নীচে, দুর্ধর্ষ সব মূর্তি ও অঙ্কিত চিত্র বা ম্যুরালের সামনে দাঁড়িয়ে সাধারণ মানুষ যে সংগীত শুনতে চাইতেন সেটাই বারোক। জমকালো! 

বারোক যুগের অন্যতম বিখ্যাত সুরগুলি এখনো জনসমাজে সমানভাবে সমাদৃত। কিন্তু আপনি কিভাবে চিনবেন যে সেটা বারোক কিনা? আমি যেমন সুরকারের নাম ধরে চিনি। সুরকারদের নাম জেনে শুনলে কিছুদিন পরেই নিজেই ধরতে পারবেন তাদের বৈশিষ্ট্য। ধরা যাক আপনাকে কয়েকটা নাম বলা হল। প্যাচেলবেল, বাখ, তারতিনি, ভিভালডি, মন্টেভার্ডি, হ্যান্ডেল। 

এবার আপনি প্যাচেলবেলের বিখ্যাত ক্যানোন ইন ডি চালিয়ে শুনলেন। এই সুরটা সাহেবরা বিয়েতে বাজায়। সম্প্রতি একই সুরে মারুন ফাইভ ব্যান্ড একটি গান বের করেছে। এবার শুনলেন বাখের ব্র‍্যানডেনবার্গ কনসার্টোগুলি। ভিভালডির ফোর সিজন। এভাবে শুনতে গেলে দেখবেন কিছু কিছু সুর আগেও শুনেছেন বিভিন্ন জায়গায়, বিশেষত কার্টুনগুলিতে। এবার যদি বাছতে বসেন প্রথমেই দেখবেন সুরে প্যাঁচপয়জার বড্ড বেশি। আগেই বলেছি অলংকার বা জমকালো ব্যাপারের প্রতি বারোকের একটা আলাদা টান আছে। একটানা বেজে যাবে, থামাথামি নেই, সেইসঙ্গে ঢুকছে সূক্ষ্ণ সুর আবার কখনো ভীষণ চড়া। কখনো খুব আস্তে পরক্ষণেই তীব্রস্বরে। আমার ব্যক্তিগতভাবে মনে হয় বারোকের সুর বিশেষত বাখের সুর কানে হেডফোন দিয়ে আলো-আঁধারি ঘরে একা শুনতে হয়। মনে হবে এই বিরাট মহাবিশ্বে আমি এক ক্ষুদ্র প্রাণ। আপনিই মনে কিসের প্রতি একটা শ্রদ্ধাভাব জন্মায়। 

আবার দেখবেন প্রতিটা সুর শুনলে মনে হবে একটা জায়গায় গিয়ে দুটো সুর একসঙ্গে মিলে যাচ্ছে। যদি ভায়োলিনে সোলো শুনতে হয় নতুনদের মধ্যে হিলারি হানের বাজনা শুনতে বলব। আপনি সুরে একটা গঠনবিন্যাস পাবেন, কিন্তু তাকে ছুঁতে পারবেন না। 

সোনাটা ও কানটাটা নিয়ে একটু বলি। সোনাটা ঘড়ি হওয়ার বহু আগে থেকে আছে। ইউরোপে সোনাটা বলতে একটা বড় অংশের যন্ত্রসঙ্গীতকে বোঝায়। বেঠোফেনের মুনলাইট সোনাটার নাম হয়তো অনেকেই শুনেছে। তবে সেটা ক্লাসিকাল যুগের। বারোক যুগে সোনাটার সবে উত্থান শুরু হয়েছে। সোনাটা যেমন যন্ত্রের জন্য, কণ্ঠসঙ্গীত হলে তাকে বলত কানটাটা (ট এর উচ্চারণ কোথাও ত এর মতো)। স্প্যানিশে তো কানতো মানে গাওয়া। ইউরোপের ভাষা জানলে ভালো করে ব্যুৎপত্তিটা বলা যেত। বারোকে কানটাটার চল ছিল খুব। পরে অবশ্য সামান্য জনপ্রিয়তা হারায়। 

আলাদা করে সুইটের কথা বলব। যেমন বাখ বেশ কিছু চেলো সুইট লিখেছিলেন। সুইট মানে মিষ্টি নয়। সুইট নামক গঠনে(যেমন সোনাটা, কানটাটা বা পার্টিশিয়া বা কনসার্টো) একটা নাচের ছন্দ আছে। আপনি মোহাবেশে শরীর দুলে উঠবে। রসিক হলে চোখ বন্ধ করে মাথা দোলাবেন। সবচেয়ে বিখ্যাত হল বাখের এক নম্বর চেলো সুইটের প্রিলিউড। প্রিলিউড মানে সুরের শুরুতে যে অংশটা বাকি সুরের চলনের একটা ধারণা দেবে। সুরের পূর্বাভাস বলা যেতে পারে। বিখ্যাত চেলোবাদক ইয়ো ইয়ো মা এর বাজানো বাখের সুইটগুলি আমার ভীষণ পছন্দের। 

এবার বলতে হয় এই যুগের কনসার্টোর কথা। কনসার্টো মানে হল একজন বা দুজন একক শিল্পী এবং একটা গোটা অর্কেস্ট্রা একসঙ্গে বাজাবে। অর্থাৎ কিনা একক শিল্পী ও বাকি অর্কেস্ট্রার গুরুত্ব সমান। সেটা ভায়োলিন বা দুটো ভায়োলিন, বাঁশি বা হার্পসিকর্ড যাই হোক না কেন। হার্পসিকর্ড হল পিয়ানোর বড় ভাই৷ পিয়ানোর সাদা বোতামগুলো কালো ও কালো বোতামগুলো সাদা রঙের হয়। আরেকটা পার্থক্য হল পিয়ানোর ভেতর তারে ঠুকে শব্দ হয়। হার্পসিকর্ডে টেনে শব্দ হয়। যাই হোক, এই কনসার্টোর জনপ্রিয়তা বারোক থেকে শুরু হয়।  একটা নির্দিষ্ট সজ্জায় কনসার্টোতে বসা হত। একক শিল্পী সাধারণত অর্কেস্ট্রা কনডাকটরের (যিনি হাত নেড়ে নেড়ে তাল মেলান ও নির্দেশনা দেন) বাম বা ডানে থাকেন। সর্বদা কনডাকটরের বামদিকে ফার্স্ট ভায়োলিন, ডানদিকে সেকেন্ড ভায়োলিন, মধ্যে চেলো, ডবল বেস, কাঁসা ও কাঠের তৈরি উডউইন্ড এবং ভিওলা। তালবাদ্যে টিমপানি প্রভৃতি ব্যবহার হলে তারা থাকে কনডাকটরের সোজাসুজি। এগুলো পড়তে জটিল লাগলেও কয়েকবার কনসার্টো দেখলে (স্বচক্ষে বা আমার মতো ইউটিউবে) দেখলে পরিষ্কার হয়ে যাবে। বাখের ব্র‍্যান্ডেনবার্গ কনসার্টোর সিরিজের কথা আগেই বলেছি। আরো গাদা গাদা কনসার্টো আছে। খুঁজলেই পাবেন। 

আমি বারবার বাখের কথা বলছি কারণ বাখ আমার অন্যতম প্রিয় সুরকার। বারোকের অন্তিমযুগে বাখ না থাকলে গানের জগৎটা অন্যরকম হত। এইসময়েই সম্ভবত বারোক সর্বোচ্চ উৎকর্ষে গিয়েছিল।  পরবর্তীকালের অনেক সুরকারই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বাখের কাজ দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছেন। বাখ তো আর নাম নয়, পদবী। জোহানন সেবাস্টিয়ান বাখ। বাখ জন্মেইছিলেন একটা পরিবারে যেখানে সবাই সুরকার। সেজন্য বাখ আসলে অনেকে। কিন্তু আসল বাখ একজনই। জেএস বাখ। বাখ ছোটো থেকেই সঙ্গীত পরিমন্ডলে বড়ো হওয়ার ফলে সাংস্কৃতিক রুচিবোধ তৈরি হয়েছিলেন। তাঁর এক দাদা ছিলেন ক্যানোন ইন ডি খ্যাত প্যাচেলবেলের ছাত্র। বাখের জীবনে শিক্ষক তাঁর দাদার ভূমিকা ছিল যথেষ্ট। পরে ছাত্রাবস্থাতে এক বন্ধুর সঙ্গে দুইবছর ইউরোপের বিভিন্ন শহরে ঘুরে ও বাজিয়ে নানারকমের গানের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটে। বাখ মূলত প্রোটেস্টান্ট চার্চের চেম্বার মিউজিকের সুরকার ছিলেন। প্রচন্ড কড়া ধাতের সুরকার হওয়ায় গায়কদলের কোনো গানই তাঁর পছন্দ হত না। একবার এক ছাত্রের হাতেই মার খেতে খেতে বেঁচেছিলেন। 

এত নামী সুরকার অথচ প্রতি সপ্তাহে তাঁকে অন্তত একটা করে নতুন সুর বাজাতেই হত। রীতিমতো কঠিন কাজ। এর ফলে বাখের তৈরি সুরের সংখ্যা সহস্রাধিক। সংখ্যাটা এতটাই বেশি যে সব হয়তো উদ্ধারও করা যায়নি। আমার কথা হল একটা লোক টানা প্রতি সপ্তাহে বিশ্বমানের সুর বানিয়ে যেত কি করে? এতো আর একটা গান নয়! প্রতি সুরে কত কত যন্ত্র বাজছে! বাখ সেজন্যই বাখ। সংগীতকারদের মধ্যে প্রথমসারির! এমন কি নাসার পাঠানো মহাকাশযান ভয়েজারেও বাখের সুরের রেকর্ড পাঠানো হয়েছে। যদি কোনো ভীনগ্রহী রেকর্ড পায় তাহলে বুঝবে পৃথিবীটা কতটা সুন্দর! 

এখন প্রশ্ন আসবে বাখ তো প্রোটেস্টান্ট ছিলেন। তাহলে বারোক যা কিনা শুরুই হয়েছে ক্যাথোলিক চার্চের গৌরবকে মহিমান্বিত করতে সেই যুগে তাঁর গুরুত্ব কি? ঘটনা হল যুগ ব্যাপারটা সার্বিক। বাখ ছিলেন অন্তিম বারোক যুগের লোক। তখন প্রাচীরটা অতটাও শক্ত ছিল না। তাছাড়াও কোনো ব্যক্তি যে দলেই থাকুন যুগের হাওয়া গায়ে লাগেই। আর বাখ তো যুগোত্তর। গান যেখানে এমনিতেই সীমানা বিভেদ মানে না, সেখানে ক্যাথলিক না প্রোটেস্টান্ট কোনো কল্কেই পাবে না। বাখ এখন বিশ্বজয়ী। 

তবে ক্যাথলিকদের পাল্লাও কম ভারী না। জার্মান বাখের সঙ্গেই আরেকজনের নাম উচ্চারিত হয়। তিনি ইতালির ভিভালডি। ভিভালডি একজন ধর্মপ্রাণ ক্যাথোলিক প্রিস্ট। তিনি মাত্র পঁচিশ বছর বয়স থেকেই ভেনিসের একটা অনাথ আশ্রমে গান বাজনা শেখাতেন। এই অনাথ আশ্রমের নিয়ম ছিল অনাথ, এতিম, দুঃস্থ শিশুরা রাষ্ট্রের (ভেনিস রাজ্য, ইতালি তখনো তৈরি হয়নি) তত্ত্বাবধানে বড়ো হবে, পড়াশোনা করবে ও গানবাজনা শিখবে। পনেরো বছর বয়স হলে তাদের এই আশ্রম ছাড়তে হবে। মেয়েরা ভালো গাইলে চার্চের গানের দলেই চাকরি পেত। টানা তিন দশক ভিভালডি সেখানে গানবাজনা শেখান। নিজে অসামান্য ভায়োলিনবাদক ছিলেন বলেই বোধহয় ভিভালডির ভায়োলিনের সুর বেশি সুন্দর। তাঁর ছাত্ররাই ইউরোপের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েন ও সেইসঙ্গে চারিদিকে ভিভালডির নাম হয়। বাখ নিজেও ভিভালডির দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েছিলেন।

ইতালি থেকে ফ্রান্স, আল্পস পেরিয়ে ভিভালডির সুর জার্মানি পৌঁছলেও তাঁর মৃত্যুর কিছুদিন পরেই সবাই তাঁকে ভুলে গেল। শেষের দিকে তিনি আর নাম পেতেন না। এমনকি ভিভালডির বিখ্যাত ফোর সিজনও হারিয়ে যায়। শেষে এজরা পাউন্ড প্রমুখ গুণিজনের উৎসাহে বহু বহু বছর পর ভিভালডি আবার চর্চায় ফেরেন।

১৭৩০ এর দিক থেকেই সাধারণ মানুষ নতুন রকমের সংগীতের প্রতি আকৃষ্ট হতে লাগল। ঘোরতর জটিল, অলঙ্কারপ্রাচুর্যের সুরের চেয়ে একটু সরল কিন্তু সুন্দর সুর লোকের মনে বেশি দাগ কাটছিল। স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে বারোকের দিন শেষ। তবু আল্পসের উত্তরে বাখের মহিমায় বারোকের গরিমা তখনো টিকেছিল। ১৭৫০ সালে বাখের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে বারোক যুগেরও অবসান ঘটে৷ স্কারলেত্তির নামক এক ইতালীয় সুরকারকে নতুন যুগের অন্যতম রূপকার ধরা হয়। এসময় থেকেই শুরু হয় নয়া অধ্যায়। পশ্চিমী ধ্রুপদী সংগীতে ক্লাসিকাল পিরিয়ড। 



Saturday, 31 October 2020

যাদবজীঃ এক অজানা ইতিহাস

তুলসী যাদব জন্মগ্রহণ করেন ১৯১০ সালে এলাহাবাদ শহরে। ছোটো থেকেই তুলসী ছিল মিতভাষী। কংগ্রেস সমর্থক মনোহর যাদব অসহযোগ আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ে জেল হয়৷ তখনই তুলসীর মা তুলসীকে নিয়ে মামাবাড়ি বেনারসে এসে পৌঁছন। সেটা ১৯২২ সাল। তারপর হঠাৎ করেই গান্ধিজী আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন। তখনো মনোহর যাদব জেলে। এই ঘটনা তুলসী যাদবের মনে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। তখন থেকেই তুলসী যাদব মনেপ্রাণে গান্ধিবিরোধী।

বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় তুলসী হয়ে ওঠেন হিন্দুস্তান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য। গোপনে চলতে থাকে বোমা বাঁধার পাঠ, বন্দুক চালানো। 

শানিত মুখ, একপাশে পাট করে আঁচড়ানো চুল, মোটা ফ্রেমের চশমা, শক্ত চোয়াল। যাদবজী যখন মণিকর্ণিকা ঘাটে যোগাভ্যাস করতেন তখন কোনো পুলিশের ক্ষমতা ছিল না তাকে স্বাধীনতা সংগ্রামী ভাবার। মূলত বিপ্লবীদের অস্ত্র যোগান দেওয়াই ছিল তাঁর কাজ। কেউই তাঁকে সেভাবে চিনত না, কিন্তু তিনি সবাইকেই চিনতেন। 

কিন্তু তখনই হয় পিতৃবিয়োগ। যাদবজীর মামাও মারা যান এক বছর পর। সংসারে অনটন। এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করে সংগঠনের কাজে যাদবজী আসেন কলকাতা। কিন্তু কলকাতাতে তখন দেদার ধড়-পাকড়। ফলে গা-ঢাকা দিতে তিনি চলে যান চন্দননগর। 

চন্দননগরে যাওয়ার পথে এক বিপ্লবীর বিশ্বাসঘাতকতায় তিনি ধরা পড়েন। প্রথমে অবশ্য মিতভাষী যাদবজীর কাছ থেকে পুলিশ কথা বের করতে পারেনি। কিন্তু বড় অঙ্কের ঘুষ দিতেই পদস্খলন হয় বিপ্লবীর। টাকার লোভে ও নিজেকে বাঁচাতে একের পর এক নাম বলে দিতে থাকেন। এভাবেই নাম আসে বীরভদ্র তিওয়ারির। বীরভদ্র ধরা পড়লে সে নাম বলে দেয় চন্দ্রশেখর আজাদের। পুলিশ আজাদকে ধরতে পারেনি, আজাদ গুলিযুদ্ধের পর আত্মহত্যা করেন। 

যাদবজী পালিয়ে চলে আসেন বিহার। ১৯৩১ থেকে ১৯৩৫ অবধি যাদবজী ধানবাদে থাকা শুরু করেন। এলাকার ব্যবসাদার বলদেব সিংহের সঙ্গে তাঁর দোস্তি হয়। যাদবজী তখনও বেআইনি অস্ত্রের ব্যবসা করতেন। তবে এবার বিপ্লবী বা পুলিশের হয়ে নয়, সরাসরি বিহারের মাফিয়াদের সঙ্গে শুরু হয় ওঠাবসা। বলদেব সিংহের প্রতিপক্ষ কয়লা খাদানের মালিক যশবন্ত ঠাকুরকে খুন করে যাদবজী পালিয়ে বেনারসে ফিরে আসেন। 

নিজের পুরোনো জায়গায় ফিরেও কারবার চালিয়ে যেতেন যাদবজী। বিশ্বযুদ্ধের সময় লোহার দাম বাড়ায় লোহার ব্যবসা শুরু করে সে। সঙ্গে বিহারে আমেরিকান পিস্তল চালান করত। এদিকে ধানবাদে বলদেব সিং মারা গেলে ব্যবসার দায়িত্ব নিল রামাধির। 

একদিন স্বাধীনতা এলো, দেশভাগ হল। তার কয়েকদিন পরেই রামাধিরের কাছ থেকে সে পেল টেলিফোন। বলির পাঁঠা হয়ে এক দীর্ঘদেহী মুসলিম পালোয়ান আসবে। ধর্মশালাতে তাকে খুন করতে হবে। লোকটা ভীষণরকম বিপজ্জনক। পাকা হাতে দুই গজ দূর থেকে বুকে বুলেট বসিয়ে ধর্মশালা থেকে পালালেন যাদবজী। 

পঞ্চাশের দশকের গোড়ায় হিন্দি বলয়ে অনেক নতুন ছোটো বড়ো গুন্ডা ডাকাত মাফিয়া মাথাচাড়া দিল। যাদবজী নিজের যোগাযোগ ও ব্যক্তিত্বকে কাজে লাগিয়ে হয়ে উঠলেন অন্যতম বেআইনি অস্ত্রব্যবসাদার। নিজে সামনে আসতেন না। তাঁর ডান হাত মামাতো ভাই যতীশ ব্যবসা দেখত। নিজে অন্ধকারে থেকে কলকাঠি নাড়তেন যাদবজী। কেবল বড় অঙ্কের রফা হলে একা যেতেন, কারণ তাঁকে কেউই চিনত না৷ 

যাদবজী শুরু করলেন এক নতুন ব্যবসা। ব্যবসা না বলে চোট্টামো বলাই ভালো। যতীশের সঙ্গে পুলিশের ওঠাবসা ছিল। নতুন বোকা খদ্দের পেলে তাকে অল্পদামে যাদবজী বন্দুক বিক্রি করতেন৷ তারপর পুলিশকে সে ব্যাপারে খোঁজ দিয়ে সেই বন্দুক আবার নিজের হস্তুগত করতেন৷ বলা বাহুল্য পুলিশ নিজের অংশটুকু বুঝে নিত। এভাবেই একাধিকবার উঠতি গুন্ডাদের বোকা করে ভালোই চলছিল যাদবজীর। 

সত্তরের দশকে কলকাতায় নকশাল আন্দোলনে একাধিকবার অস্ত্র পাঠিয়েছেন। আবার সেই অস্ত্রের খবর পুলিশকে দিয়ে অনেক উঠতি বিপ্লবীর এনকাউন্টারও করেছেন।

কিন্তু বয়স বাড়ছিল। নতুন নতুন অনেক ব্যবসাদার উঠে আসছিল সব রাজ্যে। প্রতিযোগী বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায় টান পড়েছিল যাদবজীর। এরমধ্যে ১৯৮১ তে মারা গেল যতীশ। লোকদেখানো লোহার ব্যবসা বন্ধ হল। যতীশের ছেলে মাদ্রাজের বন্দরে কাজ করে। নিজের মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে, জামাই সরকারী কর্মচারী। তাই বুড়ো বয়সে যাদবজীকে একাই ব্যবসা সামলাতে হয়। 

মধ্যে রামাধির একাধিক অটোমেটিক বন্দুকের অর্ডার দিয়েছিল। তাতে অনেক কটা টাকা হাতে এসেছে। শেষ বয়সে যাদবজী ভেবেছিলেন বেনারসে নিজের বাড়িতেই শান্তিতে কাটাবেন। 

১৯৮৯ সালে এদিকে ধানবাদ থেকে একদিন ফোন এল সর্দার খানের। তাকে পাঠাতে হবে বিদেশী বন্দুক। ধর্মশালাতে গাঁজাখোর ছেলেটাকে দেখে মাথায় আবার বুদ্ধি খেলে গেল। বন্দুকের সাপ্লাই দিয়ে টাকা নিয়ে ঘরে এসেই ফোন করলেন পুলিশে। 

দুদিন পরেই হাতে এল সদ্য বেচা বন্দুকগুলো। যে টাকা হাতে এসেছিল তাতেই চলল বছর দুয়েক। 

আবার একদিন ফোন এল যাদবজীর কাছে। বন্দুকের অর্ডার এসেছে। এবার আগেই পুলিশকে জানিয়ে দিলেন, ধানবাদের ট্রেনে মাল যাবে। ধর্মশালায় বন্দুক নিয়ে গিয়ে দেখেন সেই গাঁজাখোর বসে। আশি বছরের বৃদ্ধ যাদবজী তাকে বন্দুক ও গুলি দেখিয়ে দিলেন। 

ছেলেটা বলল ব্যাগের মধ্যে টাকা আছে। টাকা নিয়ে বেড়োনোর সময় ছেলেটা আবার ডাকল "যাদবজী"। 

ব্যাস তারপর আর মনে নেই। গাঁজাখোরের গুলিতে দরজার সামনেই লুটিয়ে পড়লেন তুলসী যাদব ওরফে যাদবজী।

লাশ ঘরে ঢুকিয়ে ধানবাদের ট্রেনে উঠল ফয়সল খান।


সূত্রঃ

১ গ্যাংস অব ওয়াসেপুর

২ উইকিপিডিয়া 

৩ আপন মনের মাধুরী

Wednesday, 28 October 2020

লুইসি গ্লকের কবিতা (Louise Gluck Poems)

 

লুইসি গ্লক ২০২০ সালে সাহিত্যে নোবেল পেয়েছেন। তাঁরই কয়েকটা কবিতা এখানে ব্লগে দিলাম। আগে ফেসবুকেও দিয়েছি। মূল কবিতাগুলো নেট ঘেঁটে পাওয়া। অনুবাদের খাতিরে কিছু পরিবর্তন করতেই হয়েছে। এগুলো আবার তবুও প্রয়াস পত্রিকাতেও পাঠিয়েছি। ওরা এখনো কিছু বলেনি। জানি না পছন্দ হবে কিনা। যদি ঝামেলা না হয়, থাক না। 

চীনেমাটি

 

চীনেমাটির বাসন বানানোয়

অদ্বিতীয় কুমোর লিও। লিও ক্রুজ।

আমি এবার তোমার জন্য

ওর বানানো বাটি

কয়েকটা কিনে আনব৷ কিন্তু

নিয়ে যাব কি করে এই পরিস্থিতিতে?

 

লিও আমাকে মরুভূমির ফুল চেনায়।

যদিও আমি বই পড়েই শিখি

কারণ ফুলের দেখা পাওয়াটাই দুষ্কর।

 

লিও বলে মানুষের বানানো জিনিসগুলো

নাকি প্রকৃতির বানানোর চেয়ে

বেশি সুন্দর।

আমি অবশ্য তা মানি না।

বারবার লিও বলে আমি ভুল,

তাই দুজনে সঠিক উত্তরের খোঁজে হাঁটতে থাকি,

কবে কবে জবাব মিলবে তা জানি না।

 

লিও আমাকে কল্পনায় বাঁচতে শেখাচ্ছেঃ

মরুভূমি পেরোনোর সময় তাই

ঠান্ডা হাওয়া দেয়,

তার বাড়ি থেকে দেখি ধোঁয়া বেরোয়।

 

চিমনি দেখে ভাবলাম ওটাই বুঝি

ভাঁটিশালা। মনে হয়

মরুরাজ্যে লিও একাই পোর্সেলিন বানায়।

 

লিও আমাকে ধমক দিলঃ

আবার তুমি স্বপ্ন দেখছ।

বললাম, ভাগ্যিস দেখছি!

তাই আগুনটা আজও জ্বলছে।

 


দুই বুড়ি

 

মাসি আর মা তাস খেলছে,

দিদার শেখানো সেই রঙ মেলানো খেলা।

 

বাইরে জৈষ্ঠের উত্তাপ।

আজকে মাসি এগিয়ে আছে দেখছি,

হাতে তার বড় তাস।

মা ফাঁপরে পড়ায় অভাব হয়েছে মনসংযোগে।

বোধহয় গরমে বিছানাটা মায়ের

পছন্দ হচ্ছে না। গত গ্রীষ্মে

বিছানাটা বাবাকে ছেড়ে দিয়ে মাকে

মাটিতে শুতে হত।

বাবা অসুস্থ থাকায় মা

গোটা খাটখানা ছেড়ে দিয়েছিল।

 

সে বছর একদিনের জন্যও মাসি

আমার মাকে নিজের বিছানায় শুতে দেয়নি।

নিজেদের মধ্যে লড়াই করতে করতে

এভাবেই ওদের বেড়ে ওঠা;

যেন যুদ্ধ করে ভালোবাসা দেখানো যায়,

আর তাচ্ছিল্য করে সম্মান।

 

দুজনের হাতেই এখন পাঁচটা করে তাস,

আরেকটু পরে হয়তো খেলা শেষ হত।

কিন্তু এই দুপুরে বাইরে যাবার জো নেই,

খেলা চালিয়ে যাওয়াটাই দস্তুর,

অন্তত একা থাকার চেয়ে ভালো।

 

দিদার দূরদর্শিতা তারিফযোগ্য!

এমনভাবে দুই মেয়েকে বানিয়েছেন যে

দুজনের হাতে তাস থাকলে

আর কাউকে লাগবে না।

 

খেলা গড়ালো বিকেল অবধি,

সূর্যের তাপ তাও এতটুকু কমেনি।

খড়তাপে মাটি পুড়ে ঝামা হল,

মাঠের ঘাস গেল হলদে হয়ে।

অন্তত মায়ের দাবী সেরকমই

আমার মাসির জিত হয়েছে বলে।

 

দেখলাম মায়ের হাতের তাসগুলো

এই প্রচন্ড তাপে উবে গেছে আকাশে,

কারণ যার হাতে কম তাস সেইই তো হারবে।

 

 

 

 

 

ইচ্ছে

 

মনে আছে শেষবার কী চেয়েছিলে?

আমার তো এদিকে ইচ্ছের শেষ নেই!

যেবার তোমাকে মিথ্যে প্রজাপতির

গল্প শুনিয়েছিলাম, জানি না

তুমি কী চেয়েছিলে।

 

তুমি আমার ইচ্ছে কী জানো?

আমি জানি না,

তবু ভাবি

শেষমেশ কোনোভাবে আমরা এক হয়ে যাব।

আর আমার যা চাই, সেটা আমার

চিরকালের ইচ্ছেঃ

আরেকটা কবিতা লেখা।

 

 

 

 

 

 

প্রথম স্মৃতি

 

বহু বছর আগে

একবার আঘাত পেয়েছিলাম।

তাই তখন বাবার বিরুদ্ধে

লালন করেছি নিবিড় প্রতিশোধস্পৃহা।

দোষ তাঁর নয়,

অপরাধী আমি নিজে।

কারণ জন্মাবধি জেনেছি

ভালোবাসা না পেলে কষ্ট নেই,

আছে ভালোবাসলে।

 


বুনো ফুল

 

সমস্ত কষ্টের শেষে

একটা দরজা থাকে,

তাকে তুমি মৃত্যু বলেছিলে।

 

মাথার অনেক ওপরে পাখির ডাক শুনি,

পাইনপাতার ফাঁক গলে

ঝিকিমিকি রোদ নামে শুকনো মাটিতে।

তবু বেঁচে থাকা দুষ্কর হয়ে ওঠে,

চেতনাকে গ্রাস করে অন্ধকার।

 

তারপর সব শেষ হলে

নির্বাক আত্মা বা ভূত সাজার

ভয়ও কেটে যায়,

টোল খায় নিটোল পৃথিবী।

বেঁটে ঝোপে পাখিদের ওড়া

দেখতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ি।

 

অন্য দুনিয়াতে যাওয়ার সাঁকো

তোমার মনে থাকার কথা না।

আমি কথা বলতে পারলে

তোমাকে সাঁকো চেনাবো;

 

বলব, আমার জীবন থেকে উদ্ভাসিত

সুনীল ঝর্ণার ধারা

সমুদ্রে ছায়া ফেলেছে।

 

 

 

 

ডিপার্টমেন্টে ক্লাসের বন্ধুরাঃ একটি জাজমেন্টাল লেখা (আনএডিটেড ভার্সন)

এই লেখাটা শান্তিনিকেতনে হোস্টেলের শেষ কদিনের একদিনে লেখা। অনেকের নামে ভালো বা খারাপ বা ব্যক্তিগত জাজমেন্ট লেখা আছে। পড়লে বন্ধুবিচ্ছেদ অবধি হতে পারে। হোকগে। যাদের জাজ করলে বিচ্ছেদ হয়, তাদের বন্ধু না করাই ভালো। এখানে পোস্ট করার আগে দুবার পড়লাম বটে তবে নামমাত্র এডিটও করিনি। সমালোচনা হলে ভিউ বাড়তে পারে। কেউ বাদ গেলে আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। তবে লেখার গুণগতমান নিন্দনীয়। সব স্পষ্ট করে লেখা, কিছুক্ষেত্রে ঠিক, কিছুতে ভুল। হুঁ হুঁ। 

আমি কলকাতার লোক নই, পড়িওনি। প্রেসিডেন্সি কলেজের (বিশ্ববিদ্যালয়) বা যাদবপুরেও পড়িনি। পাতি কথা চান্স পাইনি৷ সমোস্কিতিমনস্ক কলকাতার লোকেরাদের মতোন নন্দনে সিনেমা দেখিনি, কলকাতার নামজাদা থিয়েটারও দেখিনি। আজ অব্দি কফিহাউস চিনি না৷ শুনেছি ওটা কলেজস্ট্রীটে প্রেসিডেন্সি কলেজের উল্টোদিকেই নাকি। কিন্তু দেখিনি কখনো। ফলত কফিহাউসের সেই আড্ডাটা আমার কাছে একেবারেই সোনার পাথরবাটি। যখন আমার কলকাতানিবাসী বন্ধুরা আজব সব রেস্টুরেন্টের নাম বলে, এমনকি তারা কবে কোথায় ডিসকাউন্ট পেয়েছে বলে আমি হাঁ করে চেয়ে থাকি৷ তারচেয়েও অবাক হই কলকাতার লোকেরা কি এত বাসের নম্বর আর রুট মনে রাখে!

আমার ঠাঁই হল বিশ্বভারতীতে। ইচ্ছা ছিল আমার অন্য বন্ধুদের মতো ট্রেনে চড়ে কলেজ যাব। কিন্তু বহরমপুর আর বোলপুরের সরাসরি কোনো ট্রেন নেই। অগত্যা বাস। আমার আবার বাস বা গাড়িতে বমি করার একটা সমস্যা আছে। ফলে প্রথমদিকে বমির ওষুধ খেয়ে উঠে ঘুমাতাম। কনডাক্টর সিয়ানের কাছে মুখার্জীকাকু ডেকে দিত। পরের দিকে ওষুধের দরকার হত না। কীর্নাহার আসতে আসতেই উঠে পড়তাম। এসে দেখলাম বিশ্বভারতীতে আমার ব্যাচমেটদের বেশিরভাগই লোকাল। একদম শুরুর দুমাস আমি আর বহরমপুরের বন্ধু সায়ন চৌধুরী একসঙ্গে থাকতাম একটা মেসে। পরে নন্দন হোস্টেলে চলে আসি।

ডিপার্টমেন্টে দেখলাম কদিন পর থেকেই একজন দুজন করে ক্লাস আসা বন্ধ করে দিল। কেউ ডাক্তারি পড়তে, কেউ যাদবপুররে, বহরমপুরের সাবির ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে চলে গেল। পড়ে রইল মাত্র আঠাশ জন। শেষে সেকেন্ড ইয়ারের গোড়ায় দীপ্তেন্দু গেল এয়ারফোর্স। সাতাশ জন থেকে গেল।

সামঞ্জস্য ছিল ব্যাচে। আদ্দেক মেয়ে আদ্দেক ছেলে৷ সৃজনের নেতৃত্বদানের ক্ষমতা আছে কিনা জানি না কিন্তু বন্ধুবৎসল সোজাসাপটা মানুষ হওয়ায় আর বিপুল সংখ্যক বন্ধু থাকায় ও ছিল একরকম নেতা। আবার ক্লাসের অঘোষিত মাথা ছিল অঙ্কিতা দাস আর শ্রেয়সী চৌধুরী। এরা দুজনেই যথাক্রমে অধ্যাপক অসীম কুমার দাস ও অধ্যাপক প্রাণেশ চৌধুরীর কন্যা৷ জানি না কেন অঙ্কিতা ও শ্রেয়সীর মধ্যে একটা রেষারেষি ছিল। বোঝা যেত। পরীক্ষার সময় শ্রেয়সী আর আমি পাশাপাশি থাকায় অনেক সাহায্য দেওয়া নেওয়া হয়েছে। আমি সৃজন আর অঙ্কিতা একই জায়গায় অঙ্ক করতাম। সেখানকার বদমায়েশিগুলো আর লিখলাম না।

ক্লাসে সবচেয়ে অদ্ভুত লাগত ত্রিশালাকে। ত্রিশালা ইয়ংজন (বা ইয়ংজং বা ইয়নজন, আজও জানি না) ছিল কালিম্পঙের মেয়ে। সে আবার বাংলা বোঝে না। একদিন ক্লাসে কান্নাকাটি করতে লাগল ওর কোনো বন্ধু নেই, ওর সঙ্গে কেউ ইংরেজিতে কেন কথা বলে না। তাই নিয়ে একদিন ক্লাস তোলপাড়। আমি তখনও ভুলভাল ইংরেজি বলতাম। তাতেই ঝামেলা করলাম বাংলায় বাংলা জানা জরুরি বলে। অবশ্য পুচকে অঙ্কিতা মন্ডলের ঝরঝরে ইংরেজি, ঝগরুটে মৌলি, শ্রী ঋষিকৃপা মাভৈদেবের অশ্রাব্য হিন্দি ইংরেজির দাপটে ত্রিশালা চুপ মেরে গেল। পরে ত্রিশালা বাংলা তো শিখেই ছিলই, ভালো বলতেও পারত। মৌলিকে ঝগরুটে বলা অবশ্য ভুল। ও হল ঝগড়াশ্রী। অঙ্কিতা মন্ডল এইটুকু একটা মেয়ে। আমরা ডাকি পুচকি বলে। সারাজীবনে আমি সব খাওয়া ভুলে যাব কিন্তু ওর দিদির বিয়ের খাওয়া কখনো ভুলব না। সঞ্চিতার বাবার মিষ্টির দোকান ছিল বলে পাঁঁচবছর ধারণা করে গেছি। তেমনি কি রোমিতার গোছানো প্র‍্যাকটিকাল ভোলা যাবে? বাপরে!

ক্লাসে আমার নাম ছিল মোটা কারণ গোটা ক্লাসে আমি ছিলাম কলেবরে বৃহত্তম। সুমনের নাম হল বাবাজী। সৌম্যদীপ মন্ডলের নাম পুচু। লাড়ু তো চিরকালই স্যার সুদীপ লাড়ু। হোস্টেলে বাণী দিত। বাণী অর্থে বাণীই। সামনে নাই পেছন নাই যেকোনো বিষয় মানে মোদী বিজেপি বামপন্থা থেকে ক্রিকেট বা গিটার বা র‍্যানডাম ছেলেমেয়ে সম্পর্কে কমেন্ট। আমরা বলতাম লাড়ুসিদ্ধান্ত। ওর বাণী সংকলন করলে বোধহয় জাবদা একটা বই হত। ওকে নিয়ে বেশি না বলাই ভালো। এসব পড়লে আমাকে গাল দেবে বোধহয়।
চন্দন ছিল লাড়ুর একনিষ্ঠ বন্ধু। অরগ্যানিক পড়ে পড়ে লাড়ু আর চন্দনের নামটাই হয়ে গেল অরগ্যানিক লাড়ু আর অরগ্যানিক চন্দন। শেষমেশ চন্দন দেবলীনার প্রেমে কদিন হাবুডুবুও খেল। দেবলীনা আচ্ছা সুবিধাবাদী। শুরুতে ঢং করত মেলা। পরে নূপুর মিত্রের মতোনই চুপচাপ হয়ে গেল। নূপুর কম কথাই বলে। যেদিন কথা বলত সেদিন ক্লাসে হাততালি দিত সবাই। ব্যাপারটা অবশ্যি আমি আর সৃজন ইনিশিয়েট করতাম। তবে দেবলীনার এই দেখেও চিনতে না পারা, সামনে থেকেও কথা না বলা এগুলো অভদ্রতা। তেমনি আগে চন্দ্রলেখাও নিজেকে কি একটা বড় হনু ভাবত। পরে সেসব আর ছিল না।

আমি শ্রীধর ঋষিকৃপা মাভৈদেব দাস সম্পর্কে লিখব না। কারণ তাহলে বই হয়ে যাবে। তিনি বাদ গেলেন। পরে কখনো লিখব। অনেক সময় লাগবে।

ভরত ভালো ছেলে। সব জায়গাতেই আছে অথচ কি জন্য যেন চুপচাপ, নির্লিপ্ত। ওর সব বন্ধু হোস্টেলে। আমি স্কলার হোস্টেলে আসার পরেও ভরত আসতো মাঝে মাঝে, শেষের দিকে কথা হত না তেমন। ছোটখাটো অর্ণব গনাই দেখতে ছিল চুপচাপ হাবাগোবা। কিন্তু তলায় তলায় রামমিচকে। শানিত বুদ্ধি, পড়াশোনা করত। শোনা যায় ক্যামেলিয়াকে নাকি ছক করত। করত কি? ক্যামেলিয়া যাকে নিয়ে সিনিয়রদের মধ্যে হুড়োহুড়ি পরে গিয়েছিল একসময়। আমি তো আজ অব্দি বুঝে উঠলাম না ও কেন এত বিখ্যাত৷ হ্যাঁ, ভিত্তিহীন আঁতলামোর জন্য হতে পারে৷ শৈল্পিক মন কিন্তু লজিকের বেলায় গোলমাল করত। এটা পড়লে আমাকে কথা শোনাবে গ্যারান্টি।
আর অভিষেক ছিল এক নম্বর অসহ্য ব্যক্তি। সব জায়গায় চিমটি কাটা কথা, কাউকে কখনো না খাওয়ানো ইত্যাদির জন্য আমরা সবাই অপছন্দ করতাম। সুমনাও কেমন কেমন। দেখে মনে হয় বড্ড জাজমেন্টাল। আড়চোখে তাকায় চারদিকে। একদিন কি জানি কিভাবে দুজনের মধ্যে হাল্কা সম্পর্ক গড়ে উঠল। ব্যাস। দুজনেই ক্যামন য্যানো মানুষ হয়ে গেল। হার-হারামির হাতবাক্অস অভিষেক ভালোমানুষ ছেলে হয়ে গেল। ও আজকাল গিটারটা ভালোই বাজায়৷ বেচারা শুভাশীষই মাঝখান ব্যাক পেয়ে ইয়ারলস করল।

রাজেশ হল সানগ্লাস গাই। মোটামুটি শ্রীনিকেতন এলাকা নাকি ওর পকেটে। ওর এক ডাকে পঞ্চাশজন ছেলে চলে আসবে। শ্রীনিকেতনে সূর্য চন্দ্রও শুনেছি রাজেশের ডাকে ওঠে বা অস্ত যায়। দুর্ভাগ্যবশত আমাদের হোস্টেল ডিপার্টমেন্ট এসব শান্তিনিকেতন চত্বরে হওয়ায় রাজেশের দাপট আমরা কেউ কোনোদিন দেখিনি।

তনুশ্রীর নাম যে কে হাতিভাই দিয়েছিল জানি না৷ লিখতে বসে বেশ খানিক থেমে হাতিভাই এর নামটা মনে পড়ল৷ ঈশ্বর, আমায় ক্ষমা করো।

এমএসসিতে আসা নতুনদের মধ্যে কীর্তিমান আর অরিন্দম ভালোছেলে, এদের দুজনকে আমার খুব ভালো লাগে। বেশ বন্ধু বন্ধু। অরণ্য মানে ডিপার্টমেন্টের অরণ্য দ্রুত আমাদের সঙ্গে মিশে গেছিল। অচিন্ত্যও চুপচাপ কিন্তু পাকামিতে সবার আগে। তবে সবচেয়ে মজার অথচ রহস্যময় হল পিন্টু। মুর্শিদাবাদের ছেলে পিন্টু। পিন্টুর ইতিহাস পুরোটাই রহস্যে ঢাকা। সবটা বলত না আবার জানতে চাইলেও এড়িয়ে যেত। কেউ পিন্টুকে পুরোটা চেনেনি।
মেয়েদের মধ্যে কেয়া আর রিয়া ছিল বেশ। একজন খুব রোগা আর আরেকজন আমার মতোন৷ এদের দুজনে মাঝেমাঝেই ঝামেলা লাগত, যেটা অতিশয় উপভোগ্য। মহাদেব, রাজকমলের সঙ্গে খুব বেশি আলাপ হয়নি। অনির্বাণ রায়, রনিদের আমি হয়তো বেশিদিন মনে রাখতে পারব না৷ নতুন আসা বাকি মেয়েরা এতটাই মিতভাষী অথবা নাকউঁচু তাদের মনে রেখে লাভও নেই৷

মানস আর ঋত্বিকের জন্য শেষে গোটা একটা স্তবক হয়ে যায়। মানস ভালোমানুষ। সারাক্ষণ কোথায় ফ্রিতে ইন্টারনেট দিচ্ছে, কোন সিনেমা টরেন্টে দিয়েছে এসব খবর সবার আগে মানসের কাছে পাওয়া যেত। মাথাটা বোধহয় সোনাটোনা দিয়ে বাঁধানো ছিল। অঙ্ক, ফিজিক্স আর ফিজিক্যাল সায়েন্সে ওর মতো জ্ঞান আর সাউন্ড নলেজ আমি কোথাও দেখিনি৷ আমি ঠিক কতটা পড়লে বা খাটলে মানসের মতো হব জানি না৷
যদিও মানস ক্লাসের অন্যতম সেরা ছিল কিন্তু কেমিস্ট্রি সবচেয়ে ভালো বোঝে ও জানে ঋত্বিক কর। এ হল সেই ছোকরা যার ল্যাব পার্টনার হওয়ায় ফার্স্ট ইয়ারে এক্সপেরিমেন্টাল কেমিস্ট্রিতে আমার শূণ্য কর্তৃত্ব। কিচ্ছু শিখিনি৷ সবটাই নিজে করত আর আমাকে কিচ্ছু করতে দেয়নি। এত ভালো কেমিস্ট্রি জানে অথচ অহঙ্কার নেই।

এদের সঙ্গেই অপোগন্ড আমি পড়েছি। পাঁচ বছর। তাইতো বলি আমি কলকাতা দেখিনি, প্রণবদাকে দেখেছি। বিধানদার কাছে নিরীশ্বরবাদ শিখেছি। বিচিত্র সব আইডিয়োলজির লোকের সঙ্গে ক্লাস করেছি। কমন কোশ্চেনের আশায় টিচারদের অফিসে যাচ্ছে এমনও দেখেছি আবার "ইনঅরগ্যানিক পরীক্ষা? ধুর আমি তামিল পড়ব" বলা ছেলেও দেখেছি। সত্যিকারের নাটক কেমন হয় সেটা একজনকে প্র‍্যাকটিকাল চলাকালীন বারবার অসুস্থ হয়ে পড়তে দেখে বুঝেছি। আমাকে বাসের নম্বর মনে রাখতে হয় না। পোস্টাপিস মোড় থেকে সোজা শ্রীনিকেতন যেতে অর্মত্য সেনের বাড়ির সামনে ডিয়ার পার্কের রাস্তায় শিক্ষাভবনে আমার ডিপার্টমেন্ট। আমার পাঁচ বছর৷

Wednesday, 14 October 2020

নামহীন কবিতারা

চূড়ান্ত উন্নাসিক ভাবভঙ্গির প্রকাশ হল এভাবে না বেছে যা খুশি তাই লিখে ব্লগে দেওয়া। আমার চরিত্রবিরোধী কাজ। তবু নিজের কয়েকটা এখানে রেখে দিলাম। কেউ পড়লে ভালো। নইলে আঙুর টক। আর নামও পেলাম না যুতসই, তাই নামহীন কবিতারা। যদিও এদের কারো কারো নাম ছিল, আমি ছেঁটে দিয়েছি। 

অনেক ভুল আছে। অনেক এডিট করতে হবে। গঠনমূলক সমালোচনা করে চোখে আঙুল দিয়ে কেউ ভুল দেখিয়ে দিলে আনন্দ পাবো ও পরিবর্তন করব। 


১.

চারজন কবি বসে আছে

অন্ধকারে। গোল জটলা এক

নিমগ্ন কবিতাসৃষ্টিতে।

মাঝে লোহার কড়াই-এ জ্বলছে

আগুন।

কেউ বেলছে ছন্দের লেচি,

কেউ কুটছে অমিত্রাক্ষর,

তৃতীয়জন শানাচ্ছে শব্দচাকু।

অসীম আগ্রহে শেষজন 

বানাতে চেয়েছে কালজয়ী, 

অথচ সকলই তার বুদবুদ।


মধ্যিখানে হলুদ শিখা-

কাঠপোড়ার শব্দ মাধুর্যহীন। 

চারজন কবি কবিতায় মগ্ন।

কেবল ঝিঁঝি ডাকে একা


২.


 অনেকটা লম্বা হয়ে গেছি। 

মাথার চাঁদি মেঘ ছোঁয় ছোঁয়।

ছাদে দাঁড়ালে কাঁধে বক এসে বসে,

সূর্যাস্ত দেখতে আর গঙ্গার ঘাটে যেতে হয় না। 

নীচে অজস্র হাঁটুর সমান মানুষ। 

ঘাসের জঙ্গলে পা ফেললে যেমন 

চোরকাঁটা বাঁধে,

বাঁকা চোখ পথচারীরা আমার

পায়ে তেমনি ছুঁচ ফুটিয়ে যায়। 

আমার পাজামা রক্তে ভিজে যাচ্ছে! 

আগে আগে গর্ব হোত,

বাসের ছাদ থেকে নিমেষে 

সুটকেস পেড়ে আনতাম

আর নারকেল গাছ দেখে ডাব। 

ভোরবেলা ঢ্যাঙা পা ফেলে 

দেখে এসেছি কাকের বাসায় কোকিলের ডিম।

তারপর আরো কত হাত বেড়ে গেছি। 

এখন মাথায় লালবাতি জ্বালিয়ে রাখি,

দেখি উড়োজাহাজ গতি বদলাচ্ছে আমায় বাঁচাতে।

কিন্তু আর ভালো লাগে না। 

আমার পাজামা রক্তে ভিজে যাচ্ছে!

দূর থেকে হাওড়া ব্রিজটা

চোখে পড়ে। 

দিগন্ত আমায় ধোঁকা দিয়েছে,

রাতেও ঘুম আসে না।

তখন গাড়ির আলো দেখি, ট্রেন, উল্কাপাত,

কুকুরের চিৎকার, সঙ্গম, অনন্ত ঘুম। 

কানে ঠান্ডা লাগে।

কিন্তু ভালো লাগে না। 

ঝিমধরা আলোয় গুড়ি মেরে

আবার পায়ে পায়ে ছুঁচ বিঁধে যায়,

সে নাবালক নাকি বেশ্যা? 

আমি হতাশ হয়ে পড়ছি।

কই আর তো শুঁয়োপোকা দেখতে পাই না!

পিপীলিকা সারি বহুদিন অদৃশ্য হয়ে গেছে।

আমি নিজেই এখন বহুতল।

আর কত লম্বা হব?

পা টলছে, আঙুলের ফাঁকে ফাঁকে 

চাপ রক্ত জমে, হাঁটুতে ব্যথা।

আমি লম্বা হচ্ছি।

আরো অপ্রয়োজনীয় হচ্ছি। 


৩.


একদিন সমুদ্রের পাড়ে দুহাত ছড়িয়ে দাঁড়াব।

দমকা হাওয়ায় বুকখোলা জামা 

উড়বে পতপত করে। 

পায়ের কাছে ঢেউ ভাঙবে

যেমন ভেঙে চলেছে গত লক্ষ বছর ধরে।

শেষবারের মতো

আমি একবার বুকভরে শ্বাস নিতে চাই। 

তারপর 

নাক দিয়ে, মুখ দিয়ে 

বাইরে আসবে সারা জীবনের জমানো 

নীল ধোঁয়া, সাজানো আর্তনাদ,

বেদানা রঙের কবিতারা।

একটা কালো বিন্দু দিগন্তে দেখা দিল,

ধীরপায়ে এগিয়ে আসছে আমার দিকে;

আমাকে হয়তো গ্রাস করে নেবে কিছুক্ষণে।

পেটের অন্ত্র-নাড়ি, অন্ন নিংড়ানো পাকস্থলী 

সাপের মতোন বেরিয়ে আসবে

মুখ দিয়ে,

এঁকেবেঁকে নেমে যাবে সমুদ্রে।

পেছনে তার মস্ত শহর, দেওয়াল-বাড়ি

পিচগলা রাস্তা, ইঁটখসা পাঁচির স্তূপীকৃত। 

আমি তখনও ধ্যানমগ্ন;

হাওয়ায় কাঁপে চুল, কানের লতি


৪.

শাপলা কচুরিপানা গেঁড়ি আর গুগলির ঢল।

মাঝখানে সন্ন্যাসী বক বসে দেখে

জল আর জল। 


৫.

তোমার জন্য শয়তানও লেখে কাব্য।

তবে বাজিয়ে বাঁশরী আমার কি দোষ হল? 


৬. 

দুষ্টু মেয়ে মিষ্টি হাসে বিষ্টি নামে তাতে

ভিজব বলে ছুট্টে গেছি একলা খোলা ছাতে

ছাত ভিজেছে ভিজছি আমি জ্বর না আসে পরে

কার হাসিতে ডুবতে গিয়ে মন উড়েছে ঝড়ে


৭. 

জ্ঞান আমাকে গারদে ভরে।

শুধু হলদে ফুলের নাম জানি না

বলে থমকে দাঁড়াই।


৮.

চড়াই বলে তাচ্ছিল্য করায়

প্রতিদিন ধানক্ষেতে ডুবে মরি। 


৯.

আকাশ একটা পাঁচির

যা মাটি আর শুকতারাকে 

আলাদা করেছে।


১০.

অনুভূতির অস্ত্রাগারকে

প্রেমিকা বলে। 


১১.

সকল চিন্তার কারণ

চিন্তা কিভাবে

শেষ হবে। 


১২. 

এমন সময় এলো

যখন কবিতারা সব স্লোগান হয়ে গেছে। 

একটু আগের প্রেমের ছন্দ লেখা কবি

মিছিলের অগ্রভাগে;

নাকউঁচু ছেলে, সিরিয়াল দেখা কাকু,

অফিসফেরত কেরানী, বইপোকা মেয়ে, বড়মাসি

গাইছে, হাঁটছে - প্রতিবাদে চিৎকার করছে। 


রাস্তার বাঁকের নিরক্ষরও বুঝে গেছে

কিছু একটা চলছে চারপাশে।

আড়চোখে ফিসফাস! 

কারা জানি রাতারাতি পোস্টার ফেলেছে

এদেশ নাকি তাদের। 

মানে কি এতদিন ছিল না?

নাকি কেউ ছিনিয়ে নিতে এল জুড়িগাড়ি চেপে?


প্রশ্ন উঠেছে। তাই

নরম মাংসের মানুষেরা মোড়ে মোড়ে জোট বাঁধছে।

হাতে বড় বড় প্ল্যাকার্ড।

হাড় শক্ত করছে। 

কিসের একটা ঝড় চলছে আর

সবাই শিল্পী হয়ে গেছে! 

এমন কি দেখেছিল কেউ? আগে কখনো? 


আনাড়ি লেখক কি একটা লিখেছিল চুপিচুপি। 

প্রেমিকাও জানত না। 

এমন সময় এলো

সে লেখা লোকে পড়ছে, বিস্মিত হচ্ছে, 

রাগে ফেটে পড়ছে দমচাপা আগ্নেয়গিরির মতো৷ 


দেশ কারা যেন লুঠ করতে চায়।

কারা তারা? আশেপাশের ঘাপটি মারা হার্মাদ?

ঝাঁপিয়ে পরে অসহায় গেরস্তের পরিচয় 

লুঠে নেয় তারা।

লাঠি মারে, ভেঙে ফেলে সাধের লন্ঠন। 


চারপাশে ঢাক বাজছে৷ 

ঢোল-কর্তাল, বড় বড় কাঁসর। 

লোকজন রাস্তায় হাঁটছে, ওপাশে দানবশ্রেষ্ঠ! 

এদিকে

তোমার ছোঁয়ায় আমার কবিতারা স্লোগান হয়ে গেছে। 


১৩.

দুঃখের কোনো ভয় নেই,

নিরাপত্তা লাগে না। 

তার মা নেই,

বাবা নেই,

প্রেমিকা নেই,

বন্ধু নেই,

ভাইবোন নেই,

টাকা নেই। 

দুঃখের কেবল হাতভরা শূন্যতা

আর কোলভরা আকাশ আছে৷ 


যত ব্যস্ততা আনন্দের।

যত পাইক বরকন্দাজ আনন্দকে ঘিরে৷ 

হিংসে হয় না তার? 

নাকি সোনা সাঁতলানো হাত কখনোই 

আদতে একাকিত্ব চায়নি?


১৪.

বৃষ্টি পরলে পৃথিবীটা কাদা হয়ে যায়

আর সব মানুষ কইমাছ সাজে। 

জোরে নিশ্বাস নেয়, 

উঠতে চায় তালগাছে। 

আমিও এবারের বর্ষায় কইমাছ সেজেছি

কিন্তু ফেঁসে গেছি সুগভীর পাঁকে৷ 

আজকাল কানের ফুটোতে দলা দলা কাদা এসে 

দেওয়াল বানায়,

কানকোর বিষম ব্যথা আমাকে ফুসফুস চেনাচ্ছে,

বাতাস চেনাচ্ছে। 

আমি মাছ হয়ে গেছি 

শুধু বর্ষার জল নেই। 

সব জল আয়ত দিঘীর মতো কারো

চোখে লেগে আছে। 


১৫.

নিজেকে একা একা মনে হলে 

গাছের গুঁড়ি জড়িয়ে ধরি, 

একটা অদ্ভুত আনন্দ হয়, যেন 

কোনো পুরোনো দাদুকে জড়িয়ে ধরে 

সোনার গণেশের গল্প শুনছি। 

ডালগুলো নেমে নেমে আসে, 

পাতাগুলো মাথায় হাত বুলিয়ে যায়। 

রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে 

সামনে বটগাছ পড়লে পা উঁচু করে 

মাথায় ঝুরি ঠেকিয়ে নিই।


আমি যেখানে থাকি

তার আসেপাশে অনেক অমলতাস৷ 

তাদের ফেলে দেওয়া বাঁদরলাঠিগুলো

তুলে ছুঁড়ে দিই এপাশ ওপাশ৷ 

মনে হয় পাঁচিরঘেরা সভ্য সমাজে 

অদৃশ্য হরিণ শিকার করি,  

অথচ লক্ষ্যভ্রষ্ট হচ্ছি প্রতিবার। 


গাছেদের ভাষার 

একটা দুটো শব্দও শিখেছি। 

বর্ষায় বৃষ্টি থেমে গেলে 

বুড়ো গাছগুলো কাঁদে৷ 

এখন সেসব বুঝতে পারি। 


কিন্তু ফুল ছেঁড়ার ব্যথাটা 

এখনো মাথায় ঢোকেনি। 


১৬.

অমন সহজ করে হাসি আমার ভীষণ কঠিন লাগে। 

বিজ্ঞানের বই খুঁজে যার কোনো অর্থ পাই না, 

অথচ রবীন্দ্রনাথ উলটানোর 

ধৈর্য আমার নেই। 

জানো, আমি তোমার মতোন হাসতে পারি না,

আমি তোমার মতোন করে কাঁদতেও 

পারি না৷ 


এখানে হাসলে লোকে আড়চোখে তাকায়,

কাঁদলে আড়ালে হাসে, ভাবে কাপুরুষ।

এদেশে ফুল ফোটারও অর্থ আছে,

এদেশে তারা খসাকে বলে উল্কাপাত, 

এদেশে রাতের আকাশ দেখে কেউ বলে না, সূর্য কোথায় পালালো?

বিশ্বাস করো, আমি এ যুক্তির ঝোলা বইতে পারছি না। 

কালকে  শুনলাম প্রেমের কারণ নাকি হরমোন। 

সম্মতি জানিয়েছি কারণ নইলে লোকে বলবে আমি কুসংস্কারাচ্ছন্ন। 


আজ এই এতকিছুর মধ্যেও তুমি হেসে দিলে।

কতকটা বিষ গ্যাসের মতো সে হাসির গন্ধ আমার ফুসফুস জ্বালিয়ে দিয়ে গেল।

আমি বিভোর হয়ে গেলাম,

আমি কবি হয়ে গেলাম৷ 



১৭.

আমাকে আঁকবে বলে অগ্রিম নিয়েছিল

রতনপল্লীর অরণ্য। 

বলেছিল এঁকে দেব ভাই, অনেকটা ঠিক তোমার মতো। 

তারপর সাড়ে তেরোদিন ধরে ভাড়াবাড়ির নোংরা একটা ঘরে বসেছিলাম আকাঠা হয়ে। 

নড়ে গেলে

ভেস্তে যেত খেলা। 

চুন খসা ঘরে উত্তরের গোলাপ আলোয়

আমি নিজেকে ভাবতাম গার্টুড স্টাইন

আর সামনে কলাভবনের পিকাসো। 

তারপর একদিন আঁকা শেষ হল, 

আর ওমনি অরণ্য তড়িঘড়ি সাদা কাপড়ে ঢেকে দিল ক্যানভাসটা। 

আমি বললাম কি হে। আঁকলে কেমন!

দেখি সে চুপ করে দাঁড়িয়ে। ভাবলাম ওর বুঝি অমন কুসংস্কার।

আবার খোঁচা দিলাম, কই? ছবিখানা দেখাও!

শিল্পী কোনো রূপকথার জাদু অথবা খাবারের ঢাকনা তোলার মত করে উন্মোচন করল ছবিটা।  

কিন্তু দেখি ক্যানভাসটা একেবারে বেগুনি। মাঝে দুটো সাদা আঁচড় মাত্র।  

তাতে যে আমি নেই সেটা অন্ধেও বোঝে। অথচ ভীষণ উত্তেজনায় বাইরে দৌড়ে চলে এলাম। 

না।

এরপর অরণ্যর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়নি। চেষ্টাও করিনি। 

কারণ এখন জানি ছবিতে আমি অথবা আমরা ছিলাম। 


১৮.

পৃথিবীর সমস্ত দুঃখ অথবা আনন্দই একরকম। 

আমার পছন্দের কলম হারানোর সঙ্গে 

মাতৃশোকের তুলনা হয়তো সম্ভব। 

কিন্তু তফাত

কেবল তীব্রতায়। 

প্রেমিকার সঙ্গে বাদানুবাদে অনুশোচনা, 

চাকরি পাওয়ার আনন্দ,

কখনো চাকরি হারানো আর অঙ্কে শূণ্য পাওয়ার 

তফাত আঙুর আর কিসমিসের। 

সন্তান প্রথম কথা বললঃ এর সঙ্গে 

আমার আঁকা ছবির প্রদর্শনীর 

মূলগত কোনো পার্থক্য নেই। 

পৃথিবীতে সুখের দাম কম, আর 

পৃথিবীর প্রায় সমস্ত দুঃখ একরকম। 

শুধু সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়ে 

দিগন্ত দেখতে পেয়েও তাকে

না ছুঁয়ে ফেরত আসাটা আলাদা


১৯.

পাখিরা এমনি ডাকে রোজ রোজ।

আমি অংক কষি

কোন পাখি কেমন ডাকে,

কত ইউনিট উচ্ছ্বাস আর

কত ইউনিট ব্যস্ততা।

কিন্তু বিজ্ঞান ভুলে যাই।


সকালবেলাটা নতুন রঙ করা দেওয়ালের মতো।

প্রতিটা সকালেই একটা

ঘাস ঘাস গন্ধ থাকে। 

নরম একটা ভাব, 

ঠান্ডা ভিজে একটা অনুভূতি।

আমি বিজ্ঞান মানতে খুব ভুলে যাই,

তাই দুই শালিক খুঁজি।


পাখিদের ব্যস্ততার একক

বইএ লেখা থাকে না।

নেই উচ্ছ্বাস মাপার হিসেবও। 

তাই হিসেব মেলাতে চাই, আমার

আর পোলে বসা

কাকের উচ্ছ্বাস অনুরণিত

হচ্ছে কিনা।

ভুল হয়।

ভুল হয়।

কখনো ভুলের হিসেবও

ভুল করে বসি।


এই অঙ্ক বড় কঠিন।

সকালের ওজন মাপার চেয়েও কঠিন।


২০.

এমন কিছু দুঃখ আছে, 

যে দুঃখটা কেবল আমার 

কারোর তাতে ভাগ হবে না।

সে দুঃখকে বইলে জানি 

কষ্ট বাড়ে। ক্লিষ্ট হয়ে

গুম হয়ে মেরে যাই ধুসর রঙে।

সেই ধুসরে আগাছা হয়,

সেই ধুসরে পুকুরপাড়ে

মাছরাঙা রোজ শিকার খোঁজে।

কচুপাতায় জলের ফোঁটা

গোল হয়ে যায়, 

যেমন নিটোল তোমার জীবন।

বুঝলে? তোমার এ দুঃখতে

শোক হবে না, রাগ হবে না। 

একটুকু তাই ভাগ হবে না।

এদুঃখটা কেবল আমার,

নীরব ঘরে একলা বসে

গল্প আঁকার দুঃখ এটা।


২১.

জ্যামিতির নিয়মে দুটো তল পরস্পরের ওপর একে অন্যকে ছেদ করলে একটা রেখা তৈরি হয়। অথবা ধরুন, ফাঁকা একখানা কাগজ, তাতে হাতধরাধরি করে অনেক বিন্দু; আপনি আসলে সেই রেখাগুলো পড়ছেন। কবিতা তো মাথায় তৈরি হল। আসলে আমাদের মাথায় অর্বুদ রেখা জমে আছে। একটা খবরে কাগজ পড়লে রেখায় রেখায় জুড়ে মন তাই বিশ্ব ঘুরে নেয়। নেপালের ভূমিকম্পে চিড় ধরল দার্জিলিঙের দেওয়ালে। এভাবেও রেখার জন্ম হয়।  কিন্তু যদি আমি দুটো রেখাকে নিয়ে কাটাকুটি খেলি আমার সামনে এবার একটা বিন্দু জন্ম নেবে। 

 আবার ধরুন একটা চৌকো বাক্স নিলাম। সেটা দশ হাত দূরে একটা বাক্সই থাকবে। কিন্তু দেড়শো হাত দূরে একটা তল তৈরি হবে। যেমন আকাশের চাঁদ আসলে একটা চকচকে থালা। আবার সেই বাক্সকে হাজার হাত দূরে রাখলে তল হয়ে যাবে বিন্দু। তখন বিন্দু বিন্দু পাশাপাশি বসিয়ে বানাতে পারব দিগন্তরেখা। 

আমি অবাক হই, আজকাল কাঁটাতারের বেড়া দিয়েও মানচিত্রে রেখার জন্ম হয়।  


২২.

বৃত্ত শান্তির প্রতীক।

একথা যেদিন শুনলাম

মনে হল কানের কাছের

যানজট, শব্দবিষ নিমেষে 

চৌকো হয়ে গেল। 

সাইকেল ঘন্টি রুমাল-বেড়ালের ফাঁদে

রূপ নিল রম্বসের। 

পাখির ডাকঃ কোকিল-দোয়েল

বর্গক্ষেত্রের মতো। 

কাকের ডাক ত্রিভুজ ত্রিভুজ৷ 

কিছু শব্দ চেনা, কয়েকটা বুঝলাম না। 

সেগুলো আঁকাবাঁকা রেখা হয়ে

পূব থেকে উত্তরে ধেয়ে গেছে। 

এই যে হকারের ডাক,

যখা টক কমলা বেচতে বেরিয়েছে,

ওটা ঘনক। 

মেঘমল্লার শুনলাম, সেইটা আবার 

শঙ্কুর মতো। 

সমুদ্রগর্জন শুনে

মনে হচ্ছে মাটি থেকে আকাশ অব্দি

লম্বা একটা পাইপ উঠে গেছে। 

সমস্ত শব্দ অজস্র জ্যামিতিক আকারে

ছেঁকে ধরছে আমাকে।

আমি কি বিকারগ্রস্ত? 

আমি কি কালো জলে ডুব দিয়ে 

আত্মবলি দেব? 

প্রান্তহীন অস্থিরতায় 

আমি দেরাজের আকৃতিতে চিৎকার করে উঠছি।

আমার একটা বৃত্ত চাই,

অসীম জ্যামিতিক নকশায় 

একটুকরো বৃত্ত। মায়ের গলার মতো।


২৩.

অনন্ত মরুভূমিতে 

শুয়ে আছে দুইখানি পা,

কোমর থেকে বাকিটুকু নেই।

শুকোচ্ছে রস তাই

শকুনির নেই আর মোহ।

পরে আছে তার দুইখানি পা

যে প্রেমিকার দিকে

হেঁটে যেতে চেয়েছিল। 


২৪.

এরচেয়ে বীজানু হয়ে গেলে ভালো।

তাই আর একের চিন্তা 

করতে হবে না তোমায়,

আকাশে বাতাসে ছেয়ে থাকব

লক্ষ শিশু নিয়ে। 

ভাবো তো, আমার জন্য

এক পৃথিবী মানুষ ঘরবন্দী হবে!

তখন তুমি আর আমি 

হাত-ধরাধরি করে 

বসব বড়রাস্তার মোড়ে।


২৫.

অফুরান হরিণের বনে

প্রতি বাঘই

দার্শনিক। 


২৬.

একটা গম 

একটু পরেই রুটি হয়ে যাবে। 

একটা রুটি

একটু পরেই আমি হয়ে যাব। 

আমাকে কবিতাখানা 

তাড়াতাড়ি শেষ করতে হবে- 

নইলে না জানি কখন 

সমুদ্র হয়ে যেতে পারি। 


২৭.


প্রতি বছর

নিজের মৃত্যুদিন কাটিয়ে ফেলি 

ভাত-ডাল খেয়ে। 

কখনো সন্দেহ হয় না-

দেড়, তেত্রিশ বা চুয়াত্তর বছর পর

বিছানায় শুয়ে

সেকেন্ড গুনব কিনা। 

মৃত্যু ব্যাপারটাই এমন!

একটা কালো বিন্দু

কপালের কাছে

ক্রমশ বড়ো হয়ে গিলতে আসবে,

ক্লান্ত কৃষক চাষাবাদ বন্ধ করে

তুলে রাখবে লাঙল।

দেখব,

বসন্তের পর 

চড়ুই এর শূন্য বাসায়

ভাঙা ডিমের খোলা পরে আছে। 


২৮. 

পৃথিবী একলা

দ্বীপের মতোন।

সেখানে একটি ছেলে

এবং একটি মেয়ে।

বাকিরা গাছপালা। 



Tuesday, 25 August 2020

ইউরোপীয় ধ্রুপদী সংগীতের কাহিনীঃ প্রথম পর্ব

প্রথম পর্ব

আমি ঠিক জানি না কত শতাংশ বঙ্গবাসী পশ্চিমী ধ্রুপদী সংগীত শোনেন৷ তবে সংখ্যাটি নগন্য। তবু কেউ কেউ আজকাল পশ্চিমের ক্লাসিকাল শুনছেন দেখি। পশ্চিমী গানমাত্রেই ঝ্যাংঝ্যাং, চিৎকার, পেটকামড়ানো ডাক, কুকুরকেত্তন (আমজনতা এসব বলে থাকেন, আমি বহুজনের কাছে শুনেছি) নয়। ইউরোপের ক্লাসিকাল সংগীত প্রাচ্যের গানের মতোন বা কখনো তারচেয়েও অনেকাংশে বেশি সুন্দর। সে না হয় তর্ক সাপেক্ষ। কিন্তু দুই গীতদর্শনের মধ্যে প্রভেদ তো আছেই। 

যা মনে হয়, হিন্দুস্তানি ক্লাসিকাল ও ইউরোপের ক্লাসিকালের মধ্যে মূল পার্থক্য হল, ভারতে রাগাশ্রয়ী গান বা বাজনা হওয়ায় সেখানে বেশিরভাগটাই নিজের মতো ইম্প্রোভাইজ বা ভ্যারিয়েশন করা যায়। এখানে গায়ক বা বাদকই মুখ্য। ভারতে হিন্দুস্তানি ক্লাসিকাল সংগীতে ভাবের গুরুত্ব প্রশ্নাতীত। তাই পাঁচজন সেতারবাদক একই রাগের একই সুরকে পঁচিশরকম করে বাজাতে পারেন, স্বাধীনতা আছে। কিন্তু ইউরোপে সুরকারই প্রধাণ। দুএকটা জায়গা এদিকওদিক করে বাজালেও মূল সুরকে যা খুশি বদলানো যায় না। তাই সুরগুলো বিখ্যাত হয়েছে সুরকারের নামে। সেখানে বাদকের গুরুত্ব ইন্টারপ্রিটেশনে। একটা সুরকে একজন কিভাবে বোঝাচ্ছেন, সেইটা আসল। 

এক্ষেত্রে একটা মজার সাক্ষাৎকারের কথা বলা যায়। আন্দালুসিয়ান ফ্লেমিংকো ঘরানার প্রখ্যাত গিটারবাদক পাকো দে লুসিয়া পন্ডিত রবি শংকরকে জিগ্যেস করেছিলেন রাগ কি? উত্তরে পন্ডিত বলেছেন, রাগ কোনো স্কেল নয়, কি (key) নয়, মোড নয়। রাগ অনেক গভীর জিনিস। পন্ডিতের কথা পাকো দে লুসিয়া বুঝেছিলেন কিনা জানি না তবে ভারতের গান সম্পর্কে এক ইউরোপীয় সংগীত মহাশিল্পীর বিস্ময় এই পার্থক্যকেই নির্দেশ করে। 

আমি লিখব পাশ্চাত্য ধ্রুপদী সংগীত নিয়ে। এখানে উল্লেখ্য, আমি গাইতে জানি না, বাজাতেও পারি না সেভাবে। কিন্তু কয়েক বছর যাবৎ পশ্চিমী ধ্রুপদী শুনে এবং আমার জনৈক বন্ধু ও দাদা সাগ্নিক সামন্তের কথায় লিখতে বসেছি। লেখার একমাত্র উদ্দেশ্য যেসব অমূল্য রত্ন বৃহত্তর বাঙালী কেবল আলস্য ও উন্নাসিকতায় গ্রহণ করেনি, তাদের সামনে আনা। এমন নয় যে এগুলো জঞ্জাল ঘেঁটে বা ছাই উড়িয়ে পেয়েছি। আপনিও ইউরোপের সংগীতের থেকে মাত্র কয়েকটি ক্লিক দূরে রয়েছেন। ইউটিউব বা গুগলে সবই রয়েছে। আমি দেখিয়ে দেব মাত্র। আমার জ্ঞানও ইন্টারনেট থেকেই। তাই কোনোটাই অবাক হওয়ার বা না জানার কথা না৷ প্রয়োজনীয় সোর্সও পেয়ে যাবেন। তবে বোকার মতোন কয়েকটা লিঙ্ক শেয়ার না করে কিছু বিখ্যাত সুরকারের জীবন বা উল্লেখযোগ্য ঘটনা বললে মানুষের আগ্রহ বাড়বে। 

আমি লিখব সাতটি পর্ব৷ আগেই বলে দিলাম। আজ প্রথম। আজকে ভূমিকা, শিবের গীত আর একটু ইতিহাস ইত্যাদি করেই কাটাবো। এরপর থাকবে সুরকারদের গল্প। দ্বিতীয়তে থাকবেন বারোক যুগের বাখ ও ভিভালডি। অবশ্য সেজন্য রেনেসাঁ ও  বারোক যুগ সম্পর্কেও একটু বলা ভালো। তারপর ক্লাসিকাল যুগের মোজার্ট। চারে আসবেন ক্লাসিকাল ও রোমান্টিক যুগের সন্ধিক্ষণে বেঠোফেন। পাঁচে রোমান্টিক যুগের দুই পিয়ানোশিল্পী শপ্যাঁ ও লিৎজ। ছয়ে নিকোলো পাগানিনি ও আরো কিছু সংযোজন। সপ্তম পর্বে মিলিয়ে মিশিয়ে আরো কিছু বিখ্যাত সুরকারের গল্প। 

ইউরোপের ধ্রুপদী সংগীতের যন্ত্র বা ইন্সট্রুমেন্ট বললেই প্রথম যেটা মাথায় আসে তা হল পিয়ানো। কিন্তু সংখ্যায় দেখলে হয়তো বেহালা বা ভায়োলিনের ব্যবহার বেশি। হয়তো স্বদেশেও এর ব্যবহার বহুল বলে ইউরোপের গানের সঙ্গে পিয়ানোর সম্পর্ক গভীর। পিয়ানো আবার পার্কাসিভ যন্ত্র কিন্তু বাজে তারযন্ত্র হিসেবেই৷ পিয়ানোর কি টিপলে হাতুড়ির ঘায়ে তার বাজে বলেই বোধহয় এসব ষড়যন্ত্র। এছাড়া আছে হার্প (বীণা নয়, কক্ষনো নয়)। ভায়োলিন বাদেও একইরকম দেখতে, আকারে বড় একাধিক তারযন্ত্র আছে। কলেবর অনুযায়ী এরা হল ভিওলা, চেলো ও ডাবল বেস। এই গোত্রের যন্ত্রকে বলে ফিডল। 

বাতাসে বাজে এরকম যন্ত্র আবার দুরকম। একটা কাষ্ঠনির্মিত উডউইন্ড শ্রেণি, আরেকটা ব্রাস বা কাঁসা নির্মিত। কাঠের আকালে এখন ফাইবার, প্লাস্টিক সব দিয়েই উডউইন্ড তৈরি হচ্ছে৷ বাঁশি, পিকোলো (পুচকে বাঁশি), ক্ল্যারিনেট, ইংলিশ হর্ন (সানাই জাতীয়), বাসুন, কন্ট্রাবাসুন (মোটা ভারী আওয়াজের) এগুলো ছাড়াও স্যাক্সোফোন আছে। স্যাক্সোফোন ব্রাস মেটালের হয়েও কার্যনীতিতে কাঠদের দলেই রয়ে গেছে। কাঁসার দলে ট্রাম্পেট, ট্রমবোন, টুবা, ফরাসী হর্ন (ভেঁপু) থেকে গেছে। 

তালবাদ্যে বিভিন্ন রকমের ড্রাম আছে, কাঁসার চাকতি আছে, গং নামক কাঁসর, তেকোনো টিংটিং শব্দের ট্যাঙ্গেলও রয়েছে৷ 

তবে সিংহভাগ সুর বাজানো হয় ফিডলগুলোতে। তাদের মধ্যে আবার ভিওলা চূড়ান্ত উপেক্ষিত। ক্লাসিকাল গানের সঙ্গে যুক্ত যে কেউ জানে ভিওলা জোকসের কথা। সেটা মুখ্য নয়৷ ঘটনা হল ভায়োলিন নিজের সুর, আকার, তাকে নিয়ে দীর্ঘ গবেষণা, সুন্দরতম প্রোডাকশন ও অসংখ্য মহারথী শিল্পীর ছোঁয়ায় প্রধাণ সংগীতযন্ত্র হয়ে উঠেছে৷ অবশ্য তারমানে এই নয় যে বাকিরা ফ্যালনা। প্রত্যেক যন্ত্রেরই নিজস্বতা রয়েছে। আমি অন্তত এই ব্যাপারে নিশ্চিত যে পৃথিবীর যেকোনো যন্ত্রসংগীত কোনো পন্ডিত শিল্পীর হাতে পড়লে সেটা শুনতে ভালো হবেই। সেটা বেহালাই হোক বা কন্ট্রাবাসুন।  

কণ্ঠসংগীতে অপেরা একটা বড় দিক। অনেকটা আমাদের গীতিনাট্য বা নৃত্যনাট্যের মতোই। প্রথমদিকে যীশু-তাঁর জীবন-ক্রুসিফিকেশন এইসব নিয়ে পালা হত। পালা বলছি কারণ স্টেজে অভিনয় গান নাচ একত্রে হলে তাকে ইউরোপের পালা বা যাত্রা বা এমনি কিছু একটা বললে বোঝানো সহজ হবে৷ সেরকম গায়ক গায়িকার তিন চার অক্টেভে গলা নিয়ে খেলা করার ক্ষমতাও ছিল৷ কখনো আবার বিভিন্ন রকমের কন্ঠের ব্যবহার একত্রে কোরাসে মূর্ছনা তৈরিও হত। তেমনি চারণকবিরা বাঁধত ব্যালাড। ইতিহাস ও অ্যাসটেরিক্সের বই-এ কলরবিক্সের কথা কমবেশি সকলেই জানি। এরা ধর্মীয়, মানবজীবন ও দেশপ্রেমমূলক গান তৈরি করত। আবার প্লেগের সময় ঈশ্বরের রোষ, ক্রুসেডের সময় বীররসাত্মক গানের জনপ্রিয়তা বাড়ে৷ আরো অনেকরকমেরই গানের ধরণ ছিল বা আছে। যতদিন দিন গড়িয়েছে নয়া ঘরানা ও ভঙ্গির আগমন হয়েছে। 

আগে বেশিরভাগ গানই ছিল ভক্তিগীতি বা ধর্মসংগীত। নবজাগরণের পর থেকে সব জায়গার মতোই ধর্মীয় ওপেরার সঙ্গে রাজারাজড়ার বা সাধারণ মানুষের গল্পও উঠে এসেছে। কিন্তু বড়লোকের অপেরাই একমাত্র নাট্যমঞ্চে অনুষ্ঠিত হত না। রুচি বা ক্ষমতার নিরিখে একাধিক রকমের নাটক বা পালা চলত। প্রেক্ষাগৃহে চেয়ারে বসে উপভোগের সামর্থ্য যাদের ছিল না তাদের জন্য মেঝেতে চটও পাতা হত৷ ইংল্যান্ডে এই রকম দর্শকদের বলত গ্রাউন্ডি। কিন্তু নবজাগরণেরও অনেক আগে থেকে গান ছিল। সুর ছিল। 

সারা বিশ্বেই সঙ্গীতের ইতিহাস বহুপ্রাচীন। ইউরোপে প্রাচীন গ্রিক সভ্যতায় বা রোমে সঙ্গীত মনোরঞ্জন, শিল্প-সংস্কৃতির এক বড় দিক ছিল। ছিল হার্প। ল্যুট জাতীয় বাদ্যযন্ত্র (গিটার, সেতার, দোতারা, উকুলেলে ইত্যাদি তারযন্ত্র যে গোত্রের), বিভিন্ন বাঁশি, শিঙা, ভেঁপু ও একাধিক তালবাদ্য ব্যবহৃত হত। রোমে তাল রাখার জন্য স্ক্যাবেলাম নামক এক ধরণের খড়মের প্রচলন ছিল। গান করার সময় বা অন্য কিছু বাজানোর সময় পায়ে চটাস চটাস করে শব্দ করত। কিন্তু রোম বা গ্রিসের আমলের সংগীতের সঙ্গে আমরা যাকে ইউরোপীয় ধ্রুপদী বলি তার আগমন অনেক পরে। মধ্যযুগের শুরু থেকে তার নান্দীমুখ। 

রোমের পতন হয়েছিল ৪৭৬ খ্রীষ্টাব্দে। তখনই প্রাচীনযুগের শেষ। প্রাচীন সংগীতও ৫০০ খ্রীষ্টাব্দ থেকে পরিবর্তন হতে লাগল। তখন সংগীত ছিল অনেক সরল। মনোফোনিক অর্থাৎ তুলনামূলক  সরলভাবে চার্চে গান হত। তখন একটু একটু করে কনস্তান্তিনোপলে এশিয়ার, ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে উত্তর আফ্রিকার সংগীতের প্রভাব পড়ছে। ফলে বিভিন্ন স্থানীয় বৈশিষ্ট্য তৈরি হওয়ায় বৈচিত্র্য বাড়ল। সারা ইউরোপে একইরকমের মন্ত্রগীতি (চার্চের নিয়মানুযায়ী চ্যান্ট) তৈরির চেষ্টা হল। পোপ প্রথম গ্রেগরি চ্যান্টের ক্ষেত্রে বিশেষ সংস্কার করেন৷ সে প্রায় চোদ্দশ বছর আগের কথা। শার্লাম্যান পরবর্তী পূর্ব রোম সাম্রাজ্যের উত্থানের সঙ্গে সঙ্গে যেমন খ্রীষ্টধর্মের জনপ্রিয়তা বাড়ল, তেমনি বাড়ল চার্চের হাতে ক্ষমতা। সংগীতে চার্চের নজরদারি ও দখলদারিও বৃদ্ধি পেল। এক দেশ এক সুরের লক্ষ্যে স্বয়ং শার্লাম্যান সাম্রাজ্যে সংগীতজ্ঞদের ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। গ্রেগরি প্রণীত গ্রেগরিয়ান চ্যান্ট এখনও বিশ্বের বিভিন্ন গির্জায় গাওয়া হয়। এভাবেই ইউরোপীয় ধ্রুপদী সংগীতের যাত্রা শুরু হয়। মনোফোন থেকে আসে পলিফোনি, মেলোডি, হারমোনি। মধ্যযুগের হাজার বছরে চার্চকেন্দ্রিক বা ধর্মনিরপেক্ষ একাধিক সংগীতের ফর্ম তৈরি হয়েছে। তার সবকিছু আলোচনা করা সম্ভব না। 

নবজাগরণের কাল ধরা হয় ১৪০০ থেকে। এসময়ের সবচেয়ে বড় ঘটনা বোধহয় ছাপার যন্ত্র আবিষ্কার। এতে যা হল লিখিত সংগীত এবার ছাপার আকারে চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ল। অনেক সময় একই গানের বা সুরের একাধিক সংস্করণ বিভিন্ন জায়গায় চলত। মুদ্রিত সুর সেই সমস্যার সমাধান করল। কিন্তু যে গান চিরকালই প্রতিষ্ঠানের বাইরের তাকে কি আর ছাপাখানায় ধরা যায়? বিভিন্ন লোকগীতি একেক জায়গায় সামান্য সুর বা কথা পরিবর্তিত হয়ে চলে। আমাদের বাংলাতেই এরকম হাজার হাজার লোকগীতি আছে যার একাধিক রূপ। ভারতের ক্লাসিকাল বৈচিত্র্যময় এই একই কারণে।

আল্পস পর্বত ভাষা ও সংস্কৃতির ন্যায় দক্ষিণ ইউরোপ ও উত্তর ইউরোপের আঞ্চলিক গানেও পার্থক্য করেছে৷ ফলে জার্মানি-অস্ট্রিয়া-পোল্যান্ড বা পূর্ব ইউরোপীয় ধাঁচের চেয়ে ইতালি, ফ্রান্সের গানে প্রভেদ আছে। আবার ইতালির সঙ্গে ফরাসী গড়নেও পার্থক্য অনেক। আমার মতে ভাষার মতো ইতালি বা ফরাসী গানের কথাও একটু গোল গোল। জার্মানি অস্ট্রিয়া পোল্যান্ডে কোনা-খাঁজ একটু বেশি। আমি কোনো ভালো বা খারাপ বলছি না৷ জানি না, আমার ভুলও হতে পারে। মোট কথা মুদ্রিত সুরে এজাতীয় ভ্রমের সম্ভাবনা কম। সুরের একইরকম গঠনরূপ পাওয়ার ফলে ধীরে ধীরে তাত্ত্বিক গবেষণা ও উন্নতির চেষ্টা দেখা দিল। তৈরি হল পশ্চিমী স্বরলিপির প্রাথমিক রূপ। বাদ্যযন্ত্র প্রস্তুতকারীদের গবেষণায় পুরোনো যন্ত্রাংশের উন্নতি ও একাধিক নতুন বাদ্যযন্ত্রও তৈরি হল। এদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য অবশ্যই ভায়োলিন বা বেহালা। সে কথা অন্যদিন বলব। 

প্রায় দুশো বছরের রেনেসাঁ যুগে একাধিক নতুনত্ব ইউরোপের সংগীতকে নিয়ে যাচ্ছিল উন্নতির দিকে। আবার প্রাচীন গ্রিক রোমের সংস্কৃতিকে ফেরানোর একটা সচেতন প্রচেষ্টাও লক্ষিত হয়। এই যুগের অন্যতম সুরকার দেস প্রেজের সংগীতের প্রভাব পরবর্তী বারোক যুগের আগে অব্দি ভীষণ জনপ্রিয় ছিল। তখনই আবার হল মার্টিন লুথারের হাতে প্রোটেস্টান্ট আন্দোলন। ক্যাথলিক চার্চের বিপরীতে ধর্মীয় সংস্কার হওয়ার সঙ্গে সংগীতেও এল নতুন হাওয়া। ফলে বৈচিত্র্য বাড়ল বই কমল না। ১৫৩০ এর পর ভেনিসে নতুন রকমের এক সংগীত চর্চা শুরু হল। এই নতুনত্ব ক্রমশ ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ল। তবে রেনেসাঁ সংগীতকে হাতে ধরে বদলালেন ফ্লোরেন্সের জিওভানি দি বার্দি। তিনি নিজে সংগীতশিল্পী ছিলেন কিনা জানি না, তবে ছিলেন সংগীতের পৃষ্ঠপোষক। ফ্লোমিরেন্টিন ক্যামেরাতা নামক এক দল বানিয়ে সেখানে তৎকালীন প্রাজ্ঞ সংগীতশিল্পীদের নিয়োগ করেন। কাভালিয়েরি ও মালভেজ্জি প্রমুখ শিল্পীরা প্রায় হাতে ধরে যুগ বদলে দিলেন। শুরু হল বারোক যুগ। অবশ্য বারোক কেবল সংগীতের যুগ না, এটি একটি শিল্প আন্দোলন। কেন বারোক কোথায় বারোক সেসব আর আজকে বলতে বসব না৷ আগামী লেখায় থাকবে। 

পশ্চিমী ধ্রুপদীতে খুব ভালোর সঙ্গে খুব খারাপ কম্পোজিশনও কম নেই৷ কিন্তু কালের নিয়মে খারাপগুলো বিদেয় নিয়েছে। আবার অনেক ভালো সুরও হারিয়ে গেছে। কিন্তু মোদ্দা কথা হল পশ্চিমী ধ্রুপদীর ইতিহাস অনেক পুরোনো এবং জটিল। আমি ভীষণ গভীরে কিছু যাব না। এই লেখা পরিচয় পর্বটুকু কোনোক্রমে সেড়ে দেবে। বাকিটা পাঠকের দায়িত্ব। 

Monday, 22 June 2020

সোশ্যাল মিডিয়ায় পুস্তক সমালোচনা সম্পর্কে মন্তব্য

অনেকে বিভিন্ন বই পড়ে তার সমালোচনা লেখেন বা লিখতে চান। আমি অনেকসময়ই বই ভালো কি মন্দ তা সখের (নিন্দুকেরা বলে কেউ কেউ পেইড) সমালোচকদের কাছ থেকে জেনেই কিনি বা পড়ি। বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়া গ্রুপ অথবা গুডরিডসের মতো সাইট থেকে রিভিউ জানা যায়। আমি একজন পাঠক হিসেবে সমালোচকদের থেকে যেসব জিনিস আশা করি সেগুলো একটু বলতে চাই। অন্তত আমার কথা মাথায় রেখে কেউ লিখলে বিশেষ খুশি হব৷ 
১. লিখবেন বই এর নাম, লেখক, প্রকাশক, প্রকাশ সন, প্রচ্ছদশিল্পী ও অলঙ্কারশিল্পী, বাঁধাই এর মান, মূল্য, প্রাপ্তিস্থান। প্রয়োজনে ভূমিকা কে লিখেছেন সেটাও। অনুবাদের ক্ষেত্রে কোন ভাষায় লেখা বই, অনুবাদকের নাম বাঞ্ছনীয়। মূল লেখা কোন প্রকাশনী থেকে বেড়িয়েছে সম্ভব হলে সেটাও। সাধারণভাবে অপরিচিত লেখক হলে তার সম্পর্কে দু-চারকথা লিখলে ভালো লাগে। 
২. লেখার বিষয় বস্তু। ফিকশনজাতীয় বই এর গল্পের ট্রেলার দেবেন৷ শেষ কিভাবে হচ্ছে বলবেন না। ননফিকশন বা কবিতা জাতীয় হলে বিশদ বর্ণনাতে অসুবিধা নেই। তবে পুরোটা বলে ইন্টারেস্ট চটকে দেবেন না। 
৩. বইটির গুণাবলী বা দোষ বিশ্লেষণ করুন। বীতরাগভয়ক্রোধ হয়ে গঠনমূলক সমালোচনা করবেন। খুব ভালো, খুব খারাপ, বিচ্ছিরি, হেব্বি মার্কা কথা বা ভাব আলপটকা ব্যবহার করবেন না। কেন ভালো, কেন খারাপ, তার দর্শন কি? কোন কনটেক্সটে ব্যবহৃত সেসবের উল্লেখ প্রয়োজন। মধ্যে থেকে কোনো লাইন তুলে উল্লেখ করে গুণাগুণ বিশ্লেষণ করবেন না। অনেকক্ষেত্রে কেবল বুঝতে না পেরেই অনেকে খারাপ বা ভালো বলে দেন৷ পরে তাই নিয়ে চর্চা করে ফের রসাস্বাদন করেন৷ তাই দরকারে একাধিকবার পড়ে তবে সমালোচনা লেখা উচিৎ। ব্যক্তিগত বন্ধুত্ব বা শত্রুতা নিয়ে লিখতে বসার মানে নেই। 
৪. বইটি কাদের জন্য লেখা এটাও উল্লেখ করলে হয়৷ দুনিয়ার সব বই সকলের পাঠ্য না৷ যদিও অনেকেই অনেকরকম বই পড়েন। কিন্তু লেখকের ব্যক্তিগত মতামত এখানে চলতে পারে। যেমন সুনীল গাঙ্গুলিকে চেনাতে আমি দশ বছরের বাচ্চাকে কখনোই প্রথম আলো সাজেস্ট করব না৷ বরং কাকাবাবু পড়তে বলতে বলব৷ আবার সদ্য প্রেমাঘাতে কাতর যুবককে হঠাৎ নীরার জন্য পড়তে বলব। এরকম ব্যক্তিগত সাজেশন আমার বেশ লাগে।
৫. বইটি কেন পড়া উচিৎ বা উচিৎ নয় বলেও একটু লেখা উচিৎ। এটুকু মরাল পুলিশি পাঠক সহ্য করে নেবে৷ তবে উল্লেখ্য, খুব ভালো বই হলেও কেন পড়ব না এবং খুব খারাপ বই হলেও কেন পড়ব সেটা বললে বেশ হয়। সব ভালোতেই কুৎসিত ও সব কুৎসিতেও কিছু ভালো থাকে কিনা৷ 

এমন না যে যাঁরা লেখেন তারা কিছুই জানেন না৷ তাঁরা জানেন বলেই লেখেন৷ আমি জ্ঞানী-মূর্খ নির্বিশেষে সকল সমালোচকের প্রতি একটা আবেদন রাখলাম মাত্র৷ এই লেখায় কিছু ভুল মনে হলে নিজস্ব  সংযোজন অবশ্যই করবেন৷ ব্যক্তিগত মতামত সবসময়ই স্বাগত। 

Saturday, 30 May 2020

INTRODUCTION: My First Blog



Hi folks,
I have stopped posting on Facebook. Not because of the troubling in getting likes or shares, but I like to shift my field. For almost a decade, I expressed my chosen feelings or aired some of my poems or writings or photos on my wall. However, recently I understood that Facebook is very fluid. A piece of expression lasts only for some hours or days. People are getting zillions of posts every minute. Why should they bother mine? Even I forget an impactful post within a week. So the longevity on FB is strictly restricted by default. Moreover, it is a hatred hub. Most of the users share fake news, bully others, posts irrelevant things. I do not want to use, write or post frequently there anymore. The existence of FB for me has now shrunk down to commenting or liking others' posts. 
Blogging is a thing which can be an alternative. A blog is a permanent archive. Nobody can be my moral guardian here. I can write whatever I feel. IT cell cannot report my post easily or delete the content (unless it is hacked). Besides, blogs have a universal appeal. Even I heard one can earn from a blog. So I think my decision is worthy. 
Disclaimer! It does not mean that I will not post on Facebook ever. It will depend on my mood or circumstances. But the problem is what should I write here and in which language? I may prefer Bengali and English. It shall be bilingual. I will try to write whatever I think. It could be a poem, a short story, nonfiction, a monologue whatever. 
I have seen not many people read me. They want to see which is easy and crispy. I remember I shared Anna Akhmatova's poetry but got four reacts, posted the advertisement for our lab, only one like is there (sadly from my supervisor's spouse) and posted a funny funky article people loved it which I did not! Obviously, a scientific advertisement is not layman's concern or they might not be aware of Akhmatova but they do not bother to pay heed. I did not like that. In every second, a billion people are generating data, posting there and discussing on mostly bizarre irrelevant topics and I am struggling to engulf it. It seems they overshadow the Vishwaroopa of Lord Krishna. I ask a voluntary semi-retirement. 
BLOGGING will be my new broadcasting media. 
If you read me, I will be honoured. You will get the next write-up soon. Please do not judge me by my English knowledge. Correct me if I am wrong. Constructive criticism is always welcome. 

Best regards,
Soumyadip Ray