Wednesday, 14 October 2020

নামহীন কবিতারা

চূড়ান্ত উন্নাসিক ভাবভঙ্গির প্রকাশ হল এভাবে না বেছে যা খুশি তাই লিখে ব্লগে দেওয়া। আমার চরিত্রবিরোধী কাজ। তবু নিজের কয়েকটা এখানে রেখে দিলাম। কেউ পড়লে ভালো। নইলে আঙুর টক। আর নামও পেলাম না যুতসই, তাই নামহীন কবিতারা। যদিও এদের কারো কারো নাম ছিল, আমি ছেঁটে দিয়েছি। 

অনেক ভুল আছে। অনেক এডিট করতে হবে। গঠনমূলক সমালোচনা করে চোখে আঙুল দিয়ে কেউ ভুল দেখিয়ে দিলে আনন্দ পাবো ও পরিবর্তন করব। 


১.

চারজন কবি বসে আছে

অন্ধকারে। গোল জটলা এক

নিমগ্ন কবিতাসৃষ্টিতে।

মাঝে লোহার কড়াই-এ জ্বলছে

আগুন।

কেউ বেলছে ছন্দের লেচি,

কেউ কুটছে অমিত্রাক্ষর,

তৃতীয়জন শানাচ্ছে শব্দচাকু।

অসীম আগ্রহে শেষজন 

বানাতে চেয়েছে কালজয়ী, 

অথচ সকলই তার বুদবুদ।


মধ্যিখানে হলুদ শিখা-

কাঠপোড়ার শব্দ মাধুর্যহীন। 

চারজন কবি কবিতায় মগ্ন।

কেবল ঝিঁঝি ডাকে একা


২.


 অনেকটা লম্বা হয়ে গেছি। 

মাথার চাঁদি মেঘ ছোঁয় ছোঁয়।

ছাদে দাঁড়ালে কাঁধে বক এসে বসে,

সূর্যাস্ত দেখতে আর গঙ্গার ঘাটে যেতে হয় না। 

নীচে অজস্র হাঁটুর সমান মানুষ। 

ঘাসের জঙ্গলে পা ফেললে যেমন 

চোরকাঁটা বাঁধে,

বাঁকা চোখ পথচারীরা আমার

পায়ে তেমনি ছুঁচ ফুটিয়ে যায়। 

আমার পাজামা রক্তে ভিজে যাচ্ছে! 

আগে আগে গর্ব হোত,

বাসের ছাদ থেকে নিমেষে 

সুটকেস পেড়ে আনতাম

আর নারকেল গাছ দেখে ডাব। 

ভোরবেলা ঢ্যাঙা পা ফেলে 

দেখে এসেছি কাকের বাসায় কোকিলের ডিম।

তারপর আরো কত হাত বেড়ে গেছি। 

এখন মাথায় লালবাতি জ্বালিয়ে রাখি,

দেখি উড়োজাহাজ গতি বদলাচ্ছে আমায় বাঁচাতে।

কিন্তু আর ভালো লাগে না। 

আমার পাজামা রক্তে ভিজে যাচ্ছে!

দূর থেকে হাওড়া ব্রিজটা

চোখে পড়ে। 

দিগন্ত আমায় ধোঁকা দিয়েছে,

রাতেও ঘুম আসে না।

তখন গাড়ির আলো দেখি, ট্রেন, উল্কাপাত,

কুকুরের চিৎকার, সঙ্গম, অনন্ত ঘুম। 

কানে ঠান্ডা লাগে।

কিন্তু ভালো লাগে না। 

ঝিমধরা আলোয় গুড়ি মেরে

আবার পায়ে পায়ে ছুঁচ বিঁধে যায়,

সে নাবালক নাকি বেশ্যা? 

আমি হতাশ হয়ে পড়ছি।

কই আর তো শুঁয়োপোকা দেখতে পাই না!

পিপীলিকা সারি বহুদিন অদৃশ্য হয়ে গেছে।

আমি নিজেই এখন বহুতল।

আর কত লম্বা হব?

পা টলছে, আঙুলের ফাঁকে ফাঁকে 

চাপ রক্ত জমে, হাঁটুতে ব্যথা।

আমি লম্বা হচ্ছি।

আরো অপ্রয়োজনীয় হচ্ছি। 


৩.


একদিন সমুদ্রের পাড়ে দুহাত ছড়িয়ে দাঁড়াব।

দমকা হাওয়ায় বুকখোলা জামা 

উড়বে পতপত করে। 

পায়ের কাছে ঢেউ ভাঙবে

যেমন ভেঙে চলেছে গত লক্ষ বছর ধরে।

শেষবারের মতো

আমি একবার বুকভরে শ্বাস নিতে চাই। 

তারপর 

নাক দিয়ে, মুখ দিয়ে 

বাইরে আসবে সারা জীবনের জমানো 

নীল ধোঁয়া, সাজানো আর্তনাদ,

বেদানা রঙের কবিতারা।

একটা কালো বিন্দু দিগন্তে দেখা দিল,

ধীরপায়ে এগিয়ে আসছে আমার দিকে;

আমাকে হয়তো গ্রাস করে নেবে কিছুক্ষণে।

পেটের অন্ত্র-নাড়ি, অন্ন নিংড়ানো পাকস্থলী 

সাপের মতোন বেরিয়ে আসবে

মুখ দিয়ে,

এঁকেবেঁকে নেমে যাবে সমুদ্রে।

পেছনে তার মস্ত শহর, দেওয়াল-বাড়ি

পিচগলা রাস্তা, ইঁটখসা পাঁচির স্তূপীকৃত। 

আমি তখনও ধ্যানমগ্ন;

হাওয়ায় কাঁপে চুল, কানের লতি


৪.

শাপলা কচুরিপানা গেঁড়ি আর গুগলির ঢল।

মাঝখানে সন্ন্যাসী বক বসে দেখে

জল আর জল। 


৫.

তোমার জন্য শয়তানও লেখে কাব্য।

তবে বাজিয়ে বাঁশরী আমার কি দোষ হল? 


৬. 

দুষ্টু মেয়ে মিষ্টি হাসে বিষ্টি নামে তাতে

ভিজব বলে ছুট্টে গেছি একলা খোলা ছাতে

ছাত ভিজেছে ভিজছি আমি জ্বর না আসে পরে

কার হাসিতে ডুবতে গিয়ে মন উড়েছে ঝড়ে


৭. 

জ্ঞান আমাকে গারদে ভরে।

শুধু হলদে ফুলের নাম জানি না

বলে থমকে দাঁড়াই।


৮.

চড়াই বলে তাচ্ছিল্য করায়

প্রতিদিন ধানক্ষেতে ডুবে মরি। 


৯.

আকাশ একটা পাঁচির

যা মাটি আর শুকতারাকে 

আলাদা করেছে।


১০.

অনুভূতির অস্ত্রাগারকে

প্রেমিকা বলে। 


১১.

সকল চিন্তার কারণ

চিন্তা কিভাবে

শেষ হবে। 


১২. 

এমন সময় এলো

যখন কবিতারা সব স্লোগান হয়ে গেছে। 

একটু আগের প্রেমের ছন্দ লেখা কবি

মিছিলের অগ্রভাগে;

নাকউঁচু ছেলে, সিরিয়াল দেখা কাকু,

অফিসফেরত কেরানী, বইপোকা মেয়ে, বড়মাসি

গাইছে, হাঁটছে - প্রতিবাদে চিৎকার করছে। 


রাস্তার বাঁকের নিরক্ষরও বুঝে গেছে

কিছু একটা চলছে চারপাশে।

আড়চোখে ফিসফাস! 

কারা জানি রাতারাতি পোস্টার ফেলেছে

এদেশ নাকি তাদের। 

মানে কি এতদিন ছিল না?

নাকি কেউ ছিনিয়ে নিতে এল জুড়িগাড়ি চেপে?


প্রশ্ন উঠেছে। তাই

নরম মাংসের মানুষেরা মোড়ে মোড়ে জোট বাঁধছে।

হাতে বড় বড় প্ল্যাকার্ড।

হাড় শক্ত করছে। 

কিসের একটা ঝড় চলছে আর

সবাই শিল্পী হয়ে গেছে! 

এমন কি দেখেছিল কেউ? আগে কখনো? 


আনাড়ি লেখক কি একটা লিখেছিল চুপিচুপি। 

প্রেমিকাও জানত না। 

এমন সময় এলো

সে লেখা লোকে পড়ছে, বিস্মিত হচ্ছে, 

রাগে ফেটে পড়ছে দমচাপা আগ্নেয়গিরির মতো৷ 


দেশ কারা যেন লুঠ করতে চায়।

কারা তারা? আশেপাশের ঘাপটি মারা হার্মাদ?

ঝাঁপিয়ে পরে অসহায় গেরস্তের পরিচয় 

লুঠে নেয় তারা।

লাঠি মারে, ভেঙে ফেলে সাধের লন্ঠন। 


চারপাশে ঢাক বাজছে৷ 

ঢোল-কর্তাল, বড় বড় কাঁসর। 

লোকজন রাস্তায় হাঁটছে, ওপাশে দানবশ্রেষ্ঠ! 

এদিকে

তোমার ছোঁয়ায় আমার কবিতারা স্লোগান হয়ে গেছে। 


১৩.

দুঃখের কোনো ভয় নেই,

নিরাপত্তা লাগে না। 

তার মা নেই,

বাবা নেই,

প্রেমিকা নেই,

বন্ধু নেই,

ভাইবোন নেই,

টাকা নেই। 

দুঃখের কেবল হাতভরা শূন্যতা

আর কোলভরা আকাশ আছে৷ 


যত ব্যস্ততা আনন্দের।

যত পাইক বরকন্দাজ আনন্দকে ঘিরে৷ 

হিংসে হয় না তার? 

নাকি সোনা সাঁতলানো হাত কখনোই 

আদতে একাকিত্ব চায়নি?


১৪.

বৃষ্টি পরলে পৃথিবীটা কাদা হয়ে যায়

আর সব মানুষ কইমাছ সাজে। 

জোরে নিশ্বাস নেয়, 

উঠতে চায় তালগাছে। 

আমিও এবারের বর্ষায় কইমাছ সেজেছি

কিন্তু ফেঁসে গেছি সুগভীর পাঁকে৷ 

আজকাল কানের ফুটোতে দলা দলা কাদা এসে 

দেওয়াল বানায়,

কানকোর বিষম ব্যথা আমাকে ফুসফুস চেনাচ্ছে,

বাতাস চেনাচ্ছে। 

আমি মাছ হয়ে গেছি 

শুধু বর্ষার জল নেই। 

সব জল আয়ত দিঘীর মতো কারো

চোখে লেগে আছে। 


১৫.

নিজেকে একা একা মনে হলে 

গাছের গুঁড়ি জড়িয়ে ধরি, 

একটা অদ্ভুত আনন্দ হয়, যেন 

কোনো পুরোনো দাদুকে জড়িয়ে ধরে 

সোনার গণেশের গল্প শুনছি। 

ডালগুলো নেমে নেমে আসে, 

পাতাগুলো মাথায় হাত বুলিয়ে যায়। 

রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে 

সামনে বটগাছ পড়লে পা উঁচু করে 

মাথায় ঝুরি ঠেকিয়ে নিই।


আমি যেখানে থাকি

তার আসেপাশে অনেক অমলতাস৷ 

তাদের ফেলে দেওয়া বাঁদরলাঠিগুলো

তুলে ছুঁড়ে দিই এপাশ ওপাশ৷ 

মনে হয় পাঁচিরঘেরা সভ্য সমাজে 

অদৃশ্য হরিণ শিকার করি,  

অথচ লক্ষ্যভ্রষ্ট হচ্ছি প্রতিবার। 


গাছেদের ভাষার 

একটা দুটো শব্দও শিখেছি। 

বর্ষায় বৃষ্টি থেমে গেলে 

বুড়ো গাছগুলো কাঁদে৷ 

এখন সেসব বুঝতে পারি। 


কিন্তু ফুল ছেঁড়ার ব্যথাটা 

এখনো মাথায় ঢোকেনি। 


১৬.

অমন সহজ করে হাসি আমার ভীষণ কঠিন লাগে। 

বিজ্ঞানের বই খুঁজে যার কোনো অর্থ পাই না, 

অথচ রবীন্দ্রনাথ উলটানোর 

ধৈর্য আমার নেই। 

জানো, আমি তোমার মতোন হাসতে পারি না,

আমি তোমার মতোন করে কাঁদতেও 

পারি না৷ 


এখানে হাসলে লোকে আড়চোখে তাকায়,

কাঁদলে আড়ালে হাসে, ভাবে কাপুরুষ।

এদেশে ফুল ফোটারও অর্থ আছে,

এদেশে তারা খসাকে বলে উল্কাপাত, 

এদেশে রাতের আকাশ দেখে কেউ বলে না, সূর্য কোথায় পালালো?

বিশ্বাস করো, আমি এ যুক্তির ঝোলা বইতে পারছি না। 

কালকে  শুনলাম প্রেমের কারণ নাকি হরমোন। 

সম্মতি জানিয়েছি কারণ নইলে লোকে বলবে আমি কুসংস্কারাচ্ছন্ন। 


আজ এই এতকিছুর মধ্যেও তুমি হেসে দিলে।

কতকটা বিষ গ্যাসের মতো সে হাসির গন্ধ আমার ফুসফুস জ্বালিয়ে দিয়ে গেল।

আমি বিভোর হয়ে গেলাম,

আমি কবি হয়ে গেলাম৷ 



১৭.

আমাকে আঁকবে বলে অগ্রিম নিয়েছিল

রতনপল্লীর অরণ্য। 

বলেছিল এঁকে দেব ভাই, অনেকটা ঠিক তোমার মতো। 

তারপর সাড়ে তেরোদিন ধরে ভাড়াবাড়ির নোংরা একটা ঘরে বসেছিলাম আকাঠা হয়ে। 

নড়ে গেলে

ভেস্তে যেত খেলা। 

চুন খসা ঘরে উত্তরের গোলাপ আলোয়

আমি নিজেকে ভাবতাম গার্টুড স্টাইন

আর সামনে কলাভবনের পিকাসো। 

তারপর একদিন আঁকা শেষ হল, 

আর ওমনি অরণ্য তড়িঘড়ি সাদা কাপড়ে ঢেকে দিল ক্যানভাসটা। 

আমি বললাম কি হে। আঁকলে কেমন!

দেখি সে চুপ করে দাঁড়িয়ে। ভাবলাম ওর বুঝি অমন কুসংস্কার।

আবার খোঁচা দিলাম, কই? ছবিখানা দেখাও!

শিল্পী কোনো রূপকথার জাদু অথবা খাবারের ঢাকনা তোলার মত করে উন্মোচন করল ছবিটা।  

কিন্তু দেখি ক্যানভাসটা একেবারে বেগুনি। মাঝে দুটো সাদা আঁচড় মাত্র।  

তাতে যে আমি নেই সেটা অন্ধেও বোঝে। অথচ ভীষণ উত্তেজনায় বাইরে দৌড়ে চলে এলাম। 

না।

এরপর অরণ্যর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়নি। চেষ্টাও করিনি। 

কারণ এখন জানি ছবিতে আমি অথবা আমরা ছিলাম। 


১৮.

পৃথিবীর সমস্ত দুঃখ অথবা আনন্দই একরকম। 

আমার পছন্দের কলম হারানোর সঙ্গে 

মাতৃশোকের তুলনা হয়তো সম্ভব। 

কিন্তু তফাত

কেবল তীব্রতায়। 

প্রেমিকার সঙ্গে বাদানুবাদে অনুশোচনা, 

চাকরি পাওয়ার আনন্দ,

কখনো চাকরি হারানো আর অঙ্কে শূণ্য পাওয়ার 

তফাত আঙুর আর কিসমিসের। 

সন্তান প্রথম কথা বললঃ এর সঙ্গে 

আমার আঁকা ছবির প্রদর্শনীর 

মূলগত কোনো পার্থক্য নেই। 

পৃথিবীতে সুখের দাম কম, আর 

পৃথিবীর প্রায় সমস্ত দুঃখ একরকম। 

শুধু সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়ে 

দিগন্ত দেখতে পেয়েও তাকে

না ছুঁয়ে ফেরত আসাটা আলাদা


১৯.

পাখিরা এমনি ডাকে রোজ রোজ।

আমি অংক কষি

কোন পাখি কেমন ডাকে,

কত ইউনিট উচ্ছ্বাস আর

কত ইউনিট ব্যস্ততা।

কিন্তু বিজ্ঞান ভুলে যাই।


সকালবেলাটা নতুন রঙ করা দেওয়ালের মতো।

প্রতিটা সকালেই একটা

ঘাস ঘাস গন্ধ থাকে। 

নরম একটা ভাব, 

ঠান্ডা ভিজে একটা অনুভূতি।

আমি বিজ্ঞান মানতে খুব ভুলে যাই,

তাই দুই শালিক খুঁজি।


পাখিদের ব্যস্ততার একক

বইএ লেখা থাকে না।

নেই উচ্ছ্বাস মাপার হিসেবও। 

তাই হিসেব মেলাতে চাই, আমার

আর পোলে বসা

কাকের উচ্ছ্বাস অনুরণিত

হচ্ছে কিনা।

ভুল হয়।

ভুল হয়।

কখনো ভুলের হিসেবও

ভুল করে বসি।


এই অঙ্ক বড় কঠিন।

সকালের ওজন মাপার চেয়েও কঠিন।


২০.

এমন কিছু দুঃখ আছে, 

যে দুঃখটা কেবল আমার 

কারোর তাতে ভাগ হবে না।

সে দুঃখকে বইলে জানি 

কষ্ট বাড়ে। ক্লিষ্ট হয়ে

গুম হয়ে মেরে যাই ধুসর রঙে।

সেই ধুসরে আগাছা হয়,

সেই ধুসরে পুকুরপাড়ে

মাছরাঙা রোজ শিকার খোঁজে।

কচুপাতায় জলের ফোঁটা

গোল হয়ে যায়, 

যেমন নিটোল তোমার জীবন।

বুঝলে? তোমার এ দুঃখতে

শোক হবে না, রাগ হবে না। 

একটুকু তাই ভাগ হবে না।

এদুঃখটা কেবল আমার,

নীরব ঘরে একলা বসে

গল্প আঁকার দুঃখ এটা।


২১.

জ্যামিতির নিয়মে দুটো তল পরস্পরের ওপর একে অন্যকে ছেদ করলে একটা রেখা তৈরি হয়। অথবা ধরুন, ফাঁকা একখানা কাগজ, তাতে হাতধরাধরি করে অনেক বিন্দু; আপনি আসলে সেই রেখাগুলো পড়ছেন। কবিতা তো মাথায় তৈরি হল। আসলে আমাদের মাথায় অর্বুদ রেখা জমে আছে। একটা খবরে কাগজ পড়লে রেখায় রেখায় জুড়ে মন তাই বিশ্ব ঘুরে নেয়। নেপালের ভূমিকম্পে চিড় ধরল দার্জিলিঙের দেওয়ালে। এভাবেও রেখার জন্ম হয়।  কিন্তু যদি আমি দুটো রেখাকে নিয়ে কাটাকুটি খেলি আমার সামনে এবার একটা বিন্দু জন্ম নেবে। 

 আবার ধরুন একটা চৌকো বাক্স নিলাম। সেটা দশ হাত দূরে একটা বাক্সই থাকবে। কিন্তু দেড়শো হাত দূরে একটা তল তৈরি হবে। যেমন আকাশের চাঁদ আসলে একটা চকচকে থালা। আবার সেই বাক্সকে হাজার হাত দূরে রাখলে তল হয়ে যাবে বিন্দু। তখন বিন্দু বিন্দু পাশাপাশি বসিয়ে বানাতে পারব দিগন্তরেখা। 

আমি অবাক হই, আজকাল কাঁটাতারের বেড়া দিয়েও মানচিত্রে রেখার জন্ম হয়।  


২২.

বৃত্ত শান্তির প্রতীক।

একথা যেদিন শুনলাম

মনে হল কানের কাছের

যানজট, শব্দবিষ নিমেষে 

চৌকো হয়ে গেল। 

সাইকেল ঘন্টি রুমাল-বেড়ালের ফাঁদে

রূপ নিল রম্বসের। 

পাখির ডাকঃ কোকিল-দোয়েল

বর্গক্ষেত্রের মতো। 

কাকের ডাক ত্রিভুজ ত্রিভুজ৷ 

কিছু শব্দ চেনা, কয়েকটা বুঝলাম না। 

সেগুলো আঁকাবাঁকা রেখা হয়ে

পূব থেকে উত্তরে ধেয়ে গেছে। 

এই যে হকারের ডাক,

যখা টক কমলা বেচতে বেরিয়েছে,

ওটা ঘনক। 

মেঘমল্লার শুনলাম, সেইটা আবার 

শঙ্কুর মতো। 

সমুদ্রগর্জন শুনে

মনে হচ্ছে মাটি থেকে আকাশ অব্দি

লম্বা একটা পাইপ উঠে গেছে। 

সমস্ত শব্দ অজস্র জ্যামিতিক আকারে

ছেঁকে ধরছে আমাকে।

আমি কি বিকারগ্রস্ত? 

আমি কি কালো জলে ডুব দিয়ে 

আত্মবলি দেব? 

প্রান্তহীন অস্থিরতায় 

আমি দেরাজের আকৃতিতে চিৎকার করে উঠছি।

আমার একটা বৃত্ত চাই,

অসীম জ্যামিতিক নকশায় 

একটুকরো বৃত্ত। মায়ের গলার মতো।


২৩.

অনন্ত মরুভূমিতে 

শুয়ে আছে দুইখানি পা,

কোমর থেকে বাকিটুকু নেই।

শুকোচ্ছে রস তাই

শকুনির নেই আর মোহ।

পরে আছে তার দুইখানি পা

যে প্রেমিকার দিকে

হেঁটে যেতে চেয়েছিল। 


২৪.

এরচেয়ে বীজানু হয়ে গেলে ভালো।

তাই আর একের চিন্তা 

করতে হবে না তোমায়,

আকাশে বাতাসে ছেয়ে থাকব

লক্ষ শিশু নিয়ে। 

ভাবো তো, আমার জন্য

এক পৃথিবী মানুষ ঘরবন্দী হবে!

তখন তুমি আর আমি 

হাত-ধরাধরি করে 

বসব বড়রাস্তার মোড়ে।


২৫.

অফুরান হরিণের বনে

প্রতি বাঘই

দার্শনিক। 


২৬.

একটা গম 

একটু পরেই রুটি হয়ে যাবে। 

একটা রুটি

একটু পরেই আমি হয়ে যাব। 

আমাকে কবিতাখানা 

তাড়াতাড়ি শেষ করতে হবে- 

নইলে না জানি কখন 

সমুদ্র হয়ে যেতে পারি। 


২৭.


প্রতি বছর

নিজের মৃত্যুদিন কাটিয়ে ফেলি 

ভাত-ডাল খেয়ে। 

কখনো সন্দেহ হয় না-

দেড়, তেত্রিশ বা চুয়াত্তর বছর পর

বিছানায় শুয়ে

সেকেন্ড গুনব কিনা। 

মৃত্যু ব্যাপারটাই এমন!

একটা কালো বিন্দু

কপালের কাছে

ক্রমশ বড়ো হয়ে গিলতে আসবে,

ক্লান্ত কৃষক চাষাবাদ বন্ধ করে

তুলে রাখবে লাঙল।

দেখব,

বসন্তের পর 

চড়ুই এর শূন্য বাসায়

ভাঙা ডিমের খোলা পরে আছে। 


২৮. 

পৃথিবী একলা

দ্বীপের মতোন।

সেখানে একটি ছেলে

এবং একটি মেয়ে।

বাকিরা গাছপালা। 



No comments:

Post a Comment