লুইসি গ্লক ২০২০ সালে সাহিত্যে নোবেল পেয়েছেন। তাঁরই কয়েকটা কবিতা এখানে ব্লগে দিলাম। আগে ফেসবুকেও দিয়েছি। মূল কবিতাগুলো নেট ঘেঁটে পাওয়া। অনুবাদের খাতিরে কিছু পরিবর্তন করতেই হয়েছে। এগুলো আবার তবুও প্রয়াস পত্রিকাতেও পাঠিয়েছি। ওরা এখনো কিছু বলেনি। জানি না পছন্দ হবে কিনা। যদি ঝামেলা না হয়, থাক না।
চীনেমাটি
চীনেমাটির বাসন বানানোয়
অদ্বিতীয় কুমোর লিও। লিও ক্রুজ।
আমি এবার তোমার জন্য
ওর বানানো বাটি
কয়েকটা কিনে আনব৷ কিন্তু
নিয়ে যাব কি করে এই পরিস্থিতিতে?
লিও আমাকে মরুভূমির ফুল চেনায়।
যদিও আমি বই পড়েই শিখি
কারণ ফুলের দেখা পাওয়াটাই দুষ্কর।
লিও বলে মানুষের বানানো জিনিসগুলো
নাকি প্রকৃতির বানানোর চেয়ে
বেশি সুন্দর।
আমি অবশ্য তা মানি না।
বারবার লিও বলে আমি ভুল,
তাই দুজনে সঠিক উত্তরের খোঁজে হাঁটতে থাকি,
কবে কবে জবাব মিলবে তা জানি না।
লিও আমাকে কল্পনায় বাঁচতে শেখাচ্ছেঃ
মরুভূমি পেরোনোর সময় তাই
ঠান্ডা হাওয়া দেয়,
তার বাড়ি থেকে দেখি ধোঁয়া বেরোয়।
চিমনি দেখে ভাবলাম ওটাই বুঝি
ভাঁটিশালা। মনে হয়
মরুরাজ্যে লিও একাই পোর্সেলিন বানায়।
লিও আমাকে ধমক দিলঃ
আবার তুমি স্বপ্ন দেখছ।
বললাম, ভাগ্যিস দেখছি!
তাই আগুনটা আজও জ্বলছে।
দুই বুড়ি
মাসি আর মা তাস খেলছে,
দিদার শেখানো সেই রঙ মেলানো খেলা।
বাইরে জৈষ্ঠের উত্তাপ।
আজকে মাসি এগিয়ে আছে দেখছি,
হাতে তার বড় তাস।
মা ফাঁপরে পড়ায় অভাব হয়েছে মনসংযোগে।
বোধহয় গরমে বিছানাটা মায়ের
পছন্দ হচ্ছে না। গত গ্রীষ্মে
বিছানাটা বাবাকে ছেড়ে দিয়ে মাকে
মাটিতে শুতে হত।
বাবা অসুস্থ থাকায় মা
গোটা খাটখানা ছেড়ে দিয়েছিল।
সে বছর একদিনের জন্যও মাসি
আমার মাকে নিজের বিছানায় শুতে দেয়নি।
নিজেদের মধ্যে লড়াই করতে করতে
এভাবেই ওদের বেড়ে ওঠা;
যেন যুদ্ধ করে ভালোবাসা দেখানো যায়,
আর তাচ্ছিল্য করে সম্মান।
দুজনের হাতেই এখন পাঁচটা করে তাস,
আরেকটু পরে হয়তো খেলা শেষ হত।
কিন্তু এই দুপুরে বাইরে যাবার জো নেই,
খেলা চালিয়ে যাওয়াটাই দস্তুর,
অন্তত একা থাকার চেয়ে ভালো।
দিদার দূরদর্শিতা তারিফযোগ্য!
এমনভাবে দুই মেয়েকে বানিয়েছেন যে
দুজনের হাতে তাস থাকলে
আর কাউকে লাগবে না।
খেলা গড়ালো বিকেল অবধি,
সূর্যের তাপ তাও এতটুকু কমেনি।
খড়তাপে মাটি পুড়ে ঝামা হল,
মাঠের ঘাস গেল হলদে হয়ে।
অন্তত মায়ের দাবী সেরকমই
আমার মাসির জিত হয়েছে বলে।
দেখলাম মায়ের হাতের তাসগুলো
এই প্রচন্ড তাপে উবে গেছে আকাশে,
কারণ যার হাতে কম তাস সেইই তো হারবে।
ইচ্ছে
মনে আছে শেষবার কী চেয়েছিলে?
আমার তো এদিকে ইচ্ছের শেষ নেই!
যেবার তোমাকে মিথ্যে প্রজাপতির
গল্প শুনিয়েছিলাম, জানি না
তুমি কী চেয়েছিলে।
তুমি আমার ইচ্ছে কী জানো?
আমি জানি না,
তবু ভাবি
শেষমেশ কোনোভাবে আমরা এক হয়ে যাব।
আর আমার যা চাই, সেটা আমার
চিরকালের ইচ্ছেঃ
আরেকটা কবিতা লেখা।
প্রথম স্মৃতি
বহু বছর আগে
একবার আঘাত পেয়েছিলাম।
তাই তখন বাবার বিরুদ্ধে
লালন করেছি নিবিড় প্রতিশোধস্পৃহা।
দোষ তাঁর নয়,
অপরাধী আমি নিজে।
কারণ জন্মাবধি জেনেছি
ভালোবাসা না পেলে কষ্ট নেই,
আছে ভালোবাসলে।
বুনো ফুল
সমস্ত কষ্টের শেষে
একটা দরজা থাকে,
তাকে তুমি মৃত্যু বলেছিলে।
মাথার অনেক ওপরে পাখির ডাক শুনি,
পাইনপাতার ফাঁক গলে
ঝিকিমিকি রোদ নামে শুকনো মাটিতে।
তবু বেঁচে থাকা দুষ্কর হয়ে ওঠে,
চেতনাকে গ্রাস করে অন্ধকার।
তারপর সব শেষ হলে
নির্বাক আত্মা বা ভূত সাজার
ভয়ও কেটে যায়,
টোল খায় নিটোল পৃথিবী।
বেঁটে ঝোপে পাখিদের ওড়া
দেখতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ি।
অন্য দুনিয়াতে যাওয়ার সাঁকো
তোমার মনে থাকার কথা না।
আমি কথা বলতে পারলে
তোমাকে সাঁকো চেনাবো;
বলব, আমার জীবন থেকে উদ্ভাসিত
সুনীল ঝর্ণার ধারা
সমুদ্রে ছায়া ফেলেছে।
No comments:
Post a Comment