Wednesday, 28 October 2020

ডিপার্টমেন্টে ক্লাসের বন্ধুরাঃ একটি জাজমেন্টাল লেখা (আনএডিটেড ভার্সন)

এই লেখাটা শান্তিনিকেতনে হোস্টেলের শেষ কদিনের একদিনে লেখা। অনেকের নামে ভালো বা খারাপ বা ব্যক্তিগত জাজমেন্ট লেখা আছে। পড়লে বন্ধুবিচ্ছেদ অবধি হতে পারে। হোকগে। যাদের জাজ করলে বিচ্ছেদ হয়, তাদের বন্ধু না করাই ভালো। এখানে পোস্ট করার আগে দুবার পড়লাম বটে তবে নামমাত্র এডিটও করিনি। সমালোচনা হলে ভিউ বাড়তে পারে। কেউ বাদ গেলে আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। তবে লেখার গুণগতমান নিন্দনীয়। সব স্পষ্ট করে লেখা, কিছুক্ষেত্রে ঠিক, কিছুতে ভুল। হুঁ হুঁ। 

আমি কলকাতার লোক নই, পড়িওনি। প্রেসিডেন্সি কলেজের (বিশ্ববিদ্যালয়) বা যাদবপুরেও পড়িনি। পাতি কথা চান্স পাইনি৷ সমোস্কিতিমনস্ক কলকাতার লোকেরাদের মতোন নন্দনে সিনেমা দেখিনি, কলকাতার নামজাদা থিয়েটারও দেখিনি। আজ অব্দি কফিহাউস চিনি না৷ শুনেছি ওটা কলেজস্ট্রীটে প্রেসিডেন্সি কলেজের উল্টোদিকেই নাকি। কিন্তু দেখিনি কখনো। ফলত কফিহাউসের সেই আড্ডাটা আমার কাছে একেবারেই সোনার পাথরবাটি। যখন আমার কলকাতানিবাসী বন্ধুরা আজব সব রেস্টুরেন্টের নাম বলে, এমনকি তারা কবে কোথায় ডিসকাউন্ট পেয়েছে বলে আমি হাঁ করে চেয়ে থাকি৷ তারচেয়েও অবাক হই কলকাতার লোকেরা কি এত বাসের নম্বর আর রুট মনে রাখে!

আমার ঠাঁই হল বিশ্বভারতীতে। ইচ্ছা ছিল আমার অন্য বন্ধুদের মতো ট্রেনে চড়ে কলেজ যাব। কিন্তু বহরমপুর আর বোলপুরের সরাসরি কোনো ট্রেন নেই। অগত্যা বাস। আমার আবার বাস বা গাড়িতে বমি করার একটা সমস্যা আছে। ফলে প্রথমদিকে বমির ওষুধ খেয়ে উঠে ঘুমাতাম। কনডাক্টর সিয়ানের কাছে মুখার্জীকাকু ডেকে দিত। পরের দিকে ওষুধের দরকার হত না। কীর্নাহার আসতে আসতেই উঠে পড়তাম। এসে দেখলাম বিশ্বভারতীতে আমার ব্যাচমেটদের বেশিরভাগই লোকাল। একদম শুরুর দুমাস আমি আর বহরমপুরের বন্ধু সায়ন চৌধুরী একসঙ্গে থাকতাম একটা মেসে। পরে নন্দন হোস্টেলে চলে আসি।

ডিপার্টমেন্টে দেখলাম কদিন পর থেকেই একজন দুজন করে ক্লাস আসা বন্ধ করে দিল। কেউ ডাক্তারি পড়তে, কেউ যাদবপুররে, বহরমপুরের সাবির ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে চলে গেল। পড়ে রইল মাত্র আঠাশ জন। শেষে সেকেন্ড ইয়ারের গোড়ায় দীপ্তেন্দু গেল এয়ারফোর্স। সাতাশ জন থেকে গেল।

সামঞ্জস্য ছিল ব্যাচে। আদ্দেক মেয়ে আদ্দেক ছেলে৷ সৃজনের নেতৃত্বদানের ক্ষমতা আছে কিনা জানি না কিন্তু বন্ধুবৎসল সোজাসাপটা মানুষ হওয়ায় আর বিপুল সংখ্যক বন্ধু থাকায় ও ছিল একরকম নেতা। আবার ক্লাসের অঘোষিত মাথা ছিল অঙ্কিতা দাস আর শ্রেয়সী চৌধুরী। এরা দুজনেই যথাক্রমে অধ্যাপক অসীম কুমার দাস ও অধ্যাপক প্রাণেশ চৌধুরীর কন্যা৷ জানি না কেন অঙ্কিতা ও শ্রেয়সীর মধ্যে একটা রেষারেষি ছিল। বোঝা যেত। পরীক্ষার সময় শ্রেয়সী আর আমি পাশাপাশি থাকায় অনেক সাহায্য দেওয়া নেওয়া হয়েছে। আমি সৃজন আর অঙ্কিতা একই জায়গায় অঙ্ক করতাম। সেখানকার বদমায়েশিগুলো আর লিখলাম না।

ক্লাসে সবচেয়ে অদ্ভুত লাগত ত্রিশালাকে। ত্রিশালা ইয়ংজন (বা ইয়ংজং বা ইয়নজন, আজও জানি না) ছিল কালিম্পঙের মেয়ে। সে আবার বাংলা বোঝে না। একদিন ক্লাসে কান্নাকাটি করতে লাগল ওর কোনো বন্ধু নেই, ওর সঙ্গে কেউ ইংরেজিতে কেন কথা বলে না। তাই নিয়ে একদিন ক্লাস তোলপাড়। আমি তখনও ভুলভাল ইংরেজি বলতাম। তাতেই ঝামেলা করলাম বাংলায় বাংলা জানা জরুরি বলে। অবশ্য পুচকে অঙ্কিতা মন্ডলের ঝরঝরে ইংরেজি, ঝগরুটে মৌলি, শ্রী ঋষিকৃপা মাভৈদেবের অশ্রাব্য হিন্দি ইংরেজির দাপটে ত্রিশালা চুপ মেরে গেল। পরে ত্রিশালা বাংলা তো শিখেই ছিলই, ভালো বলতেও পারত। মৌলিকে ঝগরুটে বলা অবশ্য ভুল। ও হল ঝগড়াশ্রী। অঙ্কিতা মন্ডল এইটুকু একটা মেয়ে। আমরা ডাকি পুচকি বলে। সারাজীবনে আমি সব খাওয়া ভুলে যাব কিন্তু ওর দিদির বিয়ের খাওয়া কখনো ভুলব না। সঞ্চিতার বাবার মিষ্টির দোকান ছিল বলে পাঁঁচবছর ধারণা করে গেছি। তেমনি কি রোমিতার গোছানো প্র‍্যাকটিকাল ভোলা যাবে? বাপরে!

ক্লাসে আমার নাম ছিল মোটা কারণ গোটা ক্লাসে আমি ছিলাম কলেবরে বৃহত্তম। সুমনের নাম হল বাবাজী। সৌম্যদীপ মন্ডলের নাম পুচু। লাড়ু তো চিরকালই স্যার সুদীপ লাড়ু। হোস্টেলে বাণী দিত। বাণী অর্থে বাণীই। সামনে নাই পেছন নাই যেকোনো বিষয় মানে মোদী বিজেপি বামপন্থা থেকে ক্রিকেট বা গিটার বা র‍্যানডাম ছেলেমেয়ে সম্পর্কে কমেন্ট। আমরা বলতাম লাড়ুসিদ্ধান্ত। ওর বাণী সংকলন করলে বোধহয় জাবদা একটা বই হত। ওকে নিয়ে বেশি না বলাই ভালো। এসব পড়লে আমাকে গাল দেবে বোধহয়।
চন্দন ছিল লাড়ুর একনিষ্ঠ বন্ধু। অরগ্যানিক পড়ে পড়ে লাড়ু আর চন্দনের নামটাই হয়ে গেল অরগ্যানিক লাড়ু আর অরগ্যানিক চন্দন। শেষমেশ চন্দন দেবলীনার প্রেমে কদিন হাবুডুবুও খেল। দেবলীনা আচ্ছা সুবিধাবাদী। শুরুতে ঢং করত মেলা। পরে নূপুর মিত্রের মতোনই চুপচাপ হয়ে গেল। নূপুর কম কথাই বলে। যেদিন কথা বলত সেদিন ক্লাসে হাততালি দিত সবাই। ব্যাপারটা অবশ্যি আমি আর সৃজন ইনিশিয়েট করতাম। তবে দেবলীনার এই দেখেও চিনতে না পারা, সামনে থেকেও কথা না বলা এগুলো অভদ্রতা। তেমনি আগে চন্দ্রলেখাও নিজেকে কি একটা বড় হনু ভাবত। পরে সেসব আর ছিল না।

আমি শ্রীধর ঋষিকৃপা মাভৈদেব দাস সম্পর্কে লিখব না। কারণ তাহলে বই হয়ে যাবে। তিনি বাদ গেলেন। পরে কখনো লিখব। অনেক সময় লাগবে।

ভরত ভালো ছেলে। সব জায়গাতেই আছে অথচ কি জন্য যেন চুপচাপ, নির্লিপ্ত। ওর সব বন্ধু হোস্টেলে। আমি স্কলার হোস্টেলে আসার পরেও ভরত আসতো মাঝে মাঝে, শেষের দিকে কথা হত না তেমন। ছোটখাটো অর্ণব গনাই দেখতে ছিল চুপচাপ হাবাগোবা। কিন্তু তলায় তলায় রামমিচকে। শানিত বুদ্ধি, পড়াশোনা করত। শোনা যায় ক্যামেলিয়াকে নাকি ছক করত। করত কি? ক্যামেলিয়া যাকে নিয়ে সিনিয়রদের মধ্যে হুড়োহুড়ি পরে গিয়েছিল একসময়। আমি তো আজ অব্দি বুঝে উঠলাম না ও কেন এত বিখ্যাত৷ হ্যাঁ, ভিত্তিহীন আঁতলামোর জন্য হতে পারে৷ শৈল্পিক মন কিন্তু লজিকের বেলায় গোলমাল করত। এটা পড়লে আমাকে কথা শোনাবে গ্যারান্টি।
আর অভিষেক ছিল এক নম্বর অসহ্য ব্যক্তি। সব জায়গায় চিমটি কাটা কথা, কাউকে কখনো না খাওয়ানো ইত্যাদির জন্য আমরা সবাই অপছন্দ করতাম। সুমনাও কেমন কেমন। দেখে মনে হয় বড্ড জাজমেন্টাল। আড়চোখে তাকায় চারদিকে। একদিন কি জানি কিভাবে দুজনের মধ্যে হাল্কা সম্পর্ক গড়ে উঠল। ব্যাস। দুজনেই ক্যামন য্যানো মানুষ হয়ে গেল। হার-হারামির হাতবাক্অস অভিষেক ভালোমানুষ ছেলে হয়ে গেল। ও আজকাল গিটারটা ভালোই বাজায়৷ বেচারা শুভাশীষই মাঝখান ব্যাক পেয়ে ইয়ারলস করল।

রাজেশ হল সানগ্লাস গাই। মোটামুটি শ্রীনিকেতন এলাকা নাকি ওর পকেটে। ওর এক ডাকে পঞ্চাশজন ছেলে চলে আসবে। শ্রীনিকেতনে সূর্য চন্দ্রও শুনেছি রাজেশের ডাকে ওঠে বা অস্ত যায়। দুর্ভাগ্যবশত আমাদের হোস্টেল ডিপার্টমেন্ট এসব শান্তিনিকেতন চত্বরে হওয়ায় রাজেশের দাপট আমরা কেউ কোনোদিন দেখিনি।

তনুশ্রীর নাম যে কে হাতিভাই দিয়েছিল জানি না৷ লিখতে বসে বেশ খানিক থেমে হাতিভাই এর নামটা মনে পড়ল৷ ঈশ্বর, আমায় ক্ষমা করো।

এমএসসিতে আসা নতুনদের মধ্যে কীর্তিমান আর অরিন্দম ভালোছেলে, এদের দুজনকে আমার খুব ভালো লাগে। বেশ বন্ধু বন্ধু। অরণ্য মানে ডিপার্টমেন্টের অরণ্য দ্রুত আমাদের সঙ্গে মিশে গেছিল। অচিন্ত্যও চুপচাপ কিন্তু পাকামিতে সবার আগে। তবে সবচেয়ে মজার অথচ রহস্যময় হল পিন্টু। মুর্শিদাবাদের ছেলে পিন্টু। পিন্টুর ইতিহাস পুরোটাই রহস্যে ঢাকা। সবটা বলত না আবার জানতে চাইলেও এড়িয়ে যেত। কেউ পিন্টুকে পুরোটা চেনেনি।
মেয়েদের মধ্যে কেয়া আর রিয়া ছিল বেশ। একজন খুব রোগা আর আরেকজন আমার মতোন৷ এদের দুজনে মাঝেমাঝেই ঝামেলা লাগত, যেটা অতিশয় উপভোগ্য। মহাদেব, রাজকমলের সঙ্গে খুব বেশি আলাপ হয়নি। অনির্বাণ রায়, রনিদের আমি হয়তো বেশিদিন মনে রাখতে পারব না৷ নতুন আসা বাকি মেয়েরা এতটাই মিতভাষী অথবা নাকউঁচু তাদের মনে রেখে লাভও নেই৷

মানস আর ঋত্বিকের জন্য শেষে গোটা একটা স্তবক হয়ে যায়। মানস ভালোমানুষ। সারাক্ষণ কোথায় ফ্রিতে ইন্টারনেট দিচ্ছে, কোন সিনেমা টরেন্টে দিয়েছে এসব খবর সবার আগে মানসের কাছে পাওয়া যেত। মাথাটা বোধহয় সোনাটোনা দিয়ে বাঁধানো ছিল। অঙ্ক, ফিজিক্স আর ফিজিক্যাল সায়েন্সে ওর মতো জ্ঞান আর সাউন্ড নলেজ আমি কোথাও দেখিনি৷ আমি ঠিক কতটা পড়লে বা খাটলে মানসের মতো হব জানি না৷
যদিও মানস ক্লাসের অন্যতম সেরা ছিল কিন্তু কেমিস্ট্রি সবচেয়ে ভালো বোঝে ও জানে ঋত্বিক কর। এ হল সেই ছোকরা যার ল্যাব পার্টনার হওয়ায় ফার্স্ট ইয়ারে এক্সপেরিমেন্টাল কেমিস্ট্রিতে আমার শূণ্য কর্তৃত্ব। কিচ্ছু শিখিনি৷ সবটাই নিজে করত আর আমাকে কিচ্ছু করতে দেয়নি। এত ভালো কেমিস্ট্রি জানে অথচ অহঙ্কার নেই।

এদের সঙ্গেই অপোগন্ড আমি পড়েছি। পাঁচ বছর। তাইতো বলি আমি কলকাতা দেখিনি, প্রণবদাকে দেখেছি। বিধানদার কাছে নিরীশ্বরবাদ শিখেছি। বিচিত্র সব আইডিয়োলজির লোকের সঙ্গে ক্লাস করেছি। কমন কোশ্চেনের আশায় টিচারদের অফিসে যাচ্ছে এমনও দেখেছি আবার "ইনঅরগ্যানিক পরীক্ষা? ধুর আমি তামিল পড়ব" বলা ছেলেও দেখেছি। সত্যিকারের নাটক কেমন হয় সেটা একজনকে প্র‍্যাকটিকাল চলাকালীন বারবার অসুস্থ হয়ে পড়তে দেখে বুঝেছি। আমাকে বাসের নম্বর মনে রাখতে হয় না। পোস্টাপিস মোড় থেকে সোজা শ্রীনিকেতন যেতে অর্মত্য সেনের বাড়ির সামনে ডিয়ার পার্কের রাস্তায় শিক্ষাভবনে আমার ডিপার্টমেন্ট। আমার পাঁচ বছর৷

No comments:

Post a Comment