Saturday, 31 October 2020

যাদবজীঃ এক অজানা ইতিহাস

তুলসী যাদব জন্মগ্রহণ করেন ১৯১০ সালে এলাহাবাদ শহরে। ছোটো থেকেই তুলসী ছিল মিতভাষী। কংগ্রেস সমর্থক মনোহর যাদব অসহযোগ আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ে জেল হয়৷ তখনই তুলসীর মা তুলসীকে নিয়ে মামাবাড়ি বেনারসে এসে পৌঁছন। সেটা ১৯২২ সাল। তারপর হঠাৎ করেই গান্ধিজী আন্দোলন প্রত্যাহার করে নেন। তখনো মনোহর যাদব জেলে। এই ঘটনা তুলসী যাদবের মনে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে। তখন থেকেই তুলসী যাদব মনেপ্রাণে গান্ধিবিরোধী।

বেনারস হিন্দু ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সময় তুলসী হয়ে ওঠেন হিন্দুস্তান সোশ্যালিস্ট রিপাবলিকান অ্যাসোসিয়েশনের সদস্য। গোপনে চলতে থাকে বোমা বাঁধার পাঠ, বন্দুক চালানো। 

শানিত মুখ, একপাশে পাট করে আঁচড়ানো চুল, মোটা ফ্রেমের চশমা, শক্ত চোয়াল। যাদবজী যখন মণিকর্ণিকা ঘাটে যোগাভ্যাস করতেন তখন কোনো পুলিশের ক্ষমতা ছিল না তাকে স্বাধীনতা সংগ্রামী ভাবার। মূলত বিপ্লবীদের অস্ত্র যোগান দেওয়াই ছিল তাঁর কাজ। কেউই তাঁকে সেভাবে চিনত না, কিন্তু তিনি সবাইকেই চিনতেন। 

কিন্তু তখনই হয় পিতৃবিয়োগ। যাদবজীর মামাও মারা যান এক বছর পর। সংসারে অনটন। এদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ শেষ করে সংগঠনের কাজে যাদবজী আসেন কলকাতা। কিন্তু কলকাতাতে তখন দেদার ধড়-পাকড়। ফলে গা-ঢাকা দিতে তিনি চলে যান চন্দননগর। 

চন্দননগরে যাওয়ার পথে এক বিপ্লবীর বিশ্বাসঘাতকতায় তিনি ধরা পড়েন। প্রথমে অবশ্য মিতভাষী যাদবজীর কাছ থেকে পুলিশ কথা বের করতে পারেনি। কিন্তু বড় অঙ্কের ঘুষ দিতেই পদস্খলন হয় বিপ্লবীর। টাকার লোভে ও নিজেকে বাঁচাতে একের পর এক নাম বলে দিতে থাকেন। এভাবেই নাম আসে বীরভদ্র তিওয়ারির। বীরভদ্র ধরা পড়লে সে নাম বলে দেয় চন্দ্রশেখর আজাদের। পুলিশ আজাদকে ধরতে পারেনি, আজাদ গুলিযুদ্ধের পর আত্মহত্যা করেন। 

যাদবজী পালিয়ে চলে আসেন বিহার। ১৯৩১ থেকে ১৯৩৫ অবধি যাদবজী ধানবাদে থাকা শুরু করেন। এলাকার ব্যবসাদার বলদেব সিংহের সঙ্গে তাঁর দোস্তি হয়। যাদবজী তখনও বেআইনি অস্ত্রের ব্যবসা করতেন। তবে এবার বিপ্লবী বা পুলিশের হয়ে নয়, সরাসরি বিহারের মাফিয়াদের সঙ্গে শুরু হয় ওঠাবসা। বলদেব সিংহের প্রতিপক্ষ কয়লা খাদানের মালিক যশবন্ত ঠাকুরকে খুন করে যাদবজী পালিয়ে বেনারসে ফিরে আসেন। 

নিজের পুরোনো জায়গায় ফিরেও কারবার চালিয়ে যেতেন যাদবজী। বিশ্বযুদ্ধের সময় লোহার দাম বাড়ায় লোহার ব্যবসা শুরু করে সে। সঙ্গে বিহারে আমেরিকান পিস্তল চালান করত। এদিকে ধানবাদে বলদেব সিং মারা গেলে ব্যবসার দায়িত্ব নিল রামাধির। 

একদিন স্বাধীনতা এলো, দেশভাগ হল। তার কয়েকদিন পরেই রামাধিরের কাছ থেকে সে পেল টেলিফোন। বলির পাঁঠা হয়ে এক দীর্ঘদেহী মুসলিম পালোয়ান আসবে। ধর্মশালাতে তাকে খুন করতে হবে। লোকটা ভীষণরকম বিপজ্জনক। পাকা হাতে দুই গজ দূর থেকে বুকে বুলেট বসিয়ে ধর্মশালা থেকে পালালেন যাদবজী। 

পঞ্চাশের দশকের গোড়ায় হিন্দি বলয়ে অনেক নতুন ছোটো বড়ো গুন্ডা ডাকাত মাফিয়া মাথাচাড়া দিল। যাদবজী নিজের যোগাযোগ ও ব্যক্তিত্বকে কাজে লাগিয়ে হয়ে উঠলেন অন্যতম বেআইনি অস্ত্রব্যবসাদার। নিজে সামনে আসতেন না। তাঁর ডান হাত মামাতো ভাই যতীশ ব্যবসা দেখত। নিজে অন্ধকারে থেকে কলকাঠি নাড়তেন যাদবজী। কেবল বড় অঙ্কের রফা হলে একা যেতেন, কারণ তাঁকে কেউই চিনত না৷ 

যাদবজী শুরু করলেন এক নতুন ব্যবসা। ব্যবসা না বলে চোট্টামো বলাই ভালো। যতীশের সঙ্গে পুলিশের ওঠাবসা ছিল। নতুন বোকা খদ্দের পেলে তাকে অল্পদামে যাদবজী বন্দুক বিক্রি করতেন৷ তারপর পুলিশকে সে ব্যাপারে খোঁজ দিয়ে সেই বন্দুক আবার নিজের হস্তুগত করতেন৷ বলা বাহুল্য পুলিশ নিজের অংশটুকু বুঝে নিত। এভাবেই একাধিকবার উঠতি গুন্ডাদের বোকা করে ভালোই চলছিল যাদবজীর। 

সত্তরের দশকে কলকাতায় নকশাল আন্দোলনে একাধিকবার অস্ত্র পাঠিয়েছেন। আবার সেই অস্ত্রের খবর পুলিশকে দিয়ে অনেক উঠতি বিপ্লবীর এনকাউন্টারও করেছেন।

কিন্তু বয়স বাড়ছিল। নতুন নতুন অনেক ব্যবসাদার উঠে আসছিল সব রাজ্যে। প্রতিযোগী বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায় টান পড়েছিল যাদবজীর। এরমধ্যে ১৯৮১ তে মারা গেল যতীশ। লোকদেখানো লোহার ব্যবসা বন্ধ হল। যতীশের ছেলে মাদ্রাজের বন্দরে কাজ করে। নিজের মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে, জামাই সরকারী কর্মচারী। তাই বুড়ো বয়সে যাদবজীকে একাই ব্যবসা সামলাতে হয়। 

মধ্যে রামাধির একাধিক অটোমেটিক বন্দুকের অর্ডার দিয়েছিল। তাতে অনেক কটা টাকা হাতে এসেছে। শেষ বয়সে যাদবজী ভেবেছিলেন বেনারসে নিজের বাড়িতেই শান্তিতে কাটাবেন। 

১৯৮৯ সালে এদিকে ধানবাদ থেকে একদিন ফোন এল সর্দার খানের। তাকে পাঠাতে হবে বিদেশী বন্দুক। ধর্মশালাতে গাঁজাখোর ছেলেটাকে দেখে মাথায় আবার বুদ্ধি খেলে গেল। বন্দুকের সাপ্লাই দিয়ে টাকা নিয়ে ঘরে এসেই ফোন করলেন পুলিশে। 

দুদিন পরেই হাতে এল সদ্য বেচা বন্দুকগুলো। যে টাকা হাতে এসেছিল তাতেই চলল বছর দুয়েক। 

আবার একদিন ফোন এল যাদবজীর কাছে। বন্দুকের অর্ডার এসেছে। এবার আগেই পুলিশকে জানিয়ে দিলেন, ধানবাদের ট্রেনে মাল যাবে। ধর্মশালায় বন্দুক নিয়ে গিয়ে দেখেন সেই গাঁজাখোর বসে। আশি বছরের বৃদ্ধ যাদবজী তাকে বন্দুক ও গুলি দেখিয়ে দিলেন। 

ছেলেটা বলল ব্যাগের মধ্যে টাকা আছে। টাকা নিয়ে বেড়োনোর সময় ছেলেটা আবার ডাকল "যাদবজী"। 

ব্যাস তারপর আর মনে নেই। গাঁজাখোরের গুলিতে দরজার সামনেই লুটিয়ে পড়লেন তুলসী যাদব ওরফে যাদবজী।

লাশ ঘরে ঢুকিয়ে ধানবাদের ট্রেনে উঠল ফয়সল খান।


সূত্রঃ

১ গ্যাংস অব ওয়াসেপুর

২ উইকিপিডিয়া 

৩ আপন মনের মাধুরী

Wednesday, 28 October 2020

লুইসি গ্লকের কবিতা (Louise Gluck Poems)

 

লুইসি গ্লক ২০২০ সালে সাহিত্যে নোবেল পেয়েছেন। তাঁরই কয়েকটা কবিতা এখানে ব্লগে দিলাম। আগে ফেসবুকেও দিয়েছি। মূল কবিতাগুলো নেট ঘেঁটে পাওয়া। অনুবাদের খাতিরে কিছু পরিবর্তন করতেই হয়েছে। এগুলো আবার তবুও প্রয়াস পত্রিকাতেও পাঠিয়েছি। ওরা এখনো কিছু বলেনি। জানি না পছন্দ হবে কিনা। যদি ঝামেলা না হয়, থাক না। 

চীনেমাটি

 

চীনেমাটির বাসন বানানোয়

অদ্বিতীয় কুমোর লিও। লিও ক্রুজ।

আমি এবার তোমার জন্য

ওর বানানো বাটি

কয়েকটা কিনে আনব৷ কিন্তু

নিয়ে যাব কি করে এই পরিস্থিতিতে?

 

লিও আমাকে মরুভূমির ফুল চেনায়।

যদিও আমি বই পড়েই শিখি

কারণ ফুলের দেখা পাওয়াটাই দুষ্কর।

 

লিও বলে মানুষের বানানো জিনিসগুলো

নাকি প্রকৃতির বানানোর চেয়ে

বেশি সুন্দর।

আমি অবশ্য তা মানি না।

বারবার লিও বলে আমি ভুল,

তাই দুজনে সঠিক উত্তরের খোঁজে হাঁটতে থাকি,

কবে কবে জবাব মিলবে তা জানি না।

 

লিও আমাকে কল্পনায় বাঁচতে শেখাচ্ছেঃ

মরুভূমি পেরোনোর সময় তাই

ঠান্ডা হাওয়া দেয়,

তার বাড়ি থেকে দেখি ধোঁয়া বেরোয়।

 

চিমনি দেখে ভাবলাম ওটাই বুঝি

ভাঁটিশালা। মনে হয়

মরুরাজ্যে লিও একাই পোর্সেলিন বানায়।

 

লিও আমাকে ধমক দিলঃ

আবার তুমি স্বপ্ন দেখছ।

বললাম, ভাগ্যিস দেখছি!

তাই আগুনটা আজও জ্বলছে।

 


দুই বুড়ি

 

মাসি আর মা তাস খেলছে,

দিদার শেখানো সেই রঙ মেলানো খেলা।

 

বাইরে জৈষ্ঠের উত্তাপ।

আজকে মাসি এগিয়ে আছে দেখছি,

হাতে তার বড় তাস।

মা ফাঁপরে পড়ায় অভাব হয়েছে মনসংযোগে।

বোধহয় গরমে বিছানাটা মায়ের

পছন্দ হচ্ছে না। গত গ্রীষ্মে

বিছানাটা বাবাকে ছেড়ে দিয়ে মাকে

মাটিতে শুতে হত।

বাবা অসুস্থ থাকায় মা

গোটা খাটখানা ছেড়ে দিয়েছিল।

 

সে বছর একদিনের জন্যও মাসি

আমার মাকে নিজের বিছানায় শুতে দেয়নি।

নিজেদের মধ্যে লড়াই করতে করতে

এভাবেই ওদের বেড়ে ওঠা;

যেন যুদ্ধ করে ভালোবাসা দেখানো যায়,

আর তাচ্ছিল্য করে সম্মান।

 

দুজনের হাতেই এখন পাঁচটা করে তাস,

আরেকটু পরে হয়তো খেলা শেষ হত।

কিন্তু এই দুপুরে বাইরে যাবার জো নেই,

খেলা চালিয়ে যাওয়াটাই দস্তুর,

অন্তত একা থাকার চেয়ে ভালো।

 

দিদার দূরদর্শিতা তারিফযোগ্য!

এমনভাবে দুই মেয়েকে বানিয়েছেন যে

দুজনের হাতে তাস থাকলে

আর কাউকে লাগবে না।

 

খেলা গড়ালো বিকেল অবধি,

সূর্যের তাপ তাও এতটুকু কমেনি।

খড়তাপে মাটি পুড়ে ঝামা হল,

মাঠের ঘাস গেল হলদে হয়ে।

অন্তত মায়ের দাবী সেরকমই

আমার মাসির জিত হয়েছে বলে।

 

দেখলাম মায়ের হাতের তাসগুলো

এই প্রচন্ড তাপে উবে গেছে আকাশে,

কারণ যার হাতে কম তাস সেইই তো হারবে।

 

 

 

 

 

ইচ্ছে

 

মনে আছে শেষবার কী চেয়েছিলে?

আমার তো এদিকে ইচ্ছের শেষ নেই!

যেবার তোমাকে মিথ্যে প্রজাপতির

গল্প শুনিয়েছিলাম, জানি না

তুমি কী চেয়েছিলে।

 

তুমি আমার ইচ্ছে কী জানো?

আমি জানি না,

তবু ভাবি

শেষমেশ কোনোভাবে আমরা এক হয়ে যাব।

আর আমার যা চাই, সেটা আমার

চিরকালের ইচ্ছেঃ

আরেকটা কবিতা লেখা।

 

 

 

 

 

 

প্রথম স্মৃতি

 

বহু বছর আগে

একবার আঘাত পেয়েছিলাম।

তাই তখন বাবার বিরুদ্ধে

লালন করেছি নিবিড় প্রতিশোধস্পৃহা।

দোষ তাঁর নয়,

অপরাধী আমি নিজে।

কারণ জন্মাবধি জেনেছি

ভালোবাসা না পেলে কষ্ট নেই,

আছে ভালোবাসলে।

 


বুনো ফুল

 

সমস্ত কষ্টের শেষে

একটা দরজা থাকে,

তাকে তুমি মৃত্যু বলেছিলে।

 

মাথার অনেক ওপরে পাখির ডাক শুনি,

পাইনপাতার ফাঁক গলে

ঝিকিমিকি রোদ নামে শুকনো মাটিতে।

তবু বেঁচে থাকা দুষ্কর হয়ে ওঠে,

চেতনাকে গ্রাস করে অন্ধকার।

 

তারপর সব শেষ হলে

নির্বাক আত্মা বা ভূত সাজার

ভয়ও কেটে যায়,

টোল খায় নিটোল পৃথিবী।

বেঁটে ঝোপে পাখিদের ওড়া

দেখতে অভ্যস্ত হয়ে পড়ি।

 

অন্য দুনিয়াতে যাওয়ার সাঁকো

তোমার মনে থাকার কথা না।

আমি কথা বলতে পারলে

তোমাকে সাঁকো চেনাবো;

 

বলব, আমার জীবন থেকে উদ্ভাসিত

সুনীল ঝর্ণার ধারা

সমুদ্রে ছায়া ফেলেছে।

 

 

 

 

ডিপার্টমেন্টে ক্লাসের বন্ধুরাঃ একটি জাজমেন্টাল লেখা (আনএডিটেড ভার্সন)

এই লেখাটা শান্তিনিকেতনে হোস্টেলের শেষ কদিনের একদিনে লেখা। অনেকের নামে ভালো বা খারাপ বা ব্যক্তিগত জাজমেন্ট লেখা আছে। পড়লে বন্ধুবিচ্ছেদ অবধি হতে পারে। হোকগে। যাদের জাজ করলে বিচ্ছেদ হয়, তাদের বন্ধু না করাই ভালো। এখানে পোস্ট করার আগে দুবার পড়লাম বটে তবে নামমাত্র এডিটও করিনি। সমালোচনা হলে ভিউ বাড়তে পারে। কেউ বাদ গেলে আমি আন্তরিকভাবে দুঃখিত। তবে লেখার গুণগতমান নিন্দনীয়। সব স্পষ্ট করে লেখা, কিছুক্ষেত্রে ঠিক, কিছুতে ভুল। হুঁ হুঁ। 

আমি কলকাতার লোক নই, পড়িওনি। প্রেসিডেন্সি কলেজের (বিশ্ববিদ্যালয়) বা যাদবপুরেও পড়িনি। পাতি কথা চান্স পাইনি৷ সমোস্কিতিমনস্ক কলকাতার লোকেরাদের মতোন নন্দনে সিনেমা দেখিনি, কলকাতার নামজাদা থিয়েটারও দেখিনি। আজ অব্দি কফিহাউস চিনি না৷ শুনেছি ওটা কলেজস্ট্রীটে প্রেসিডেন্সি কলেজের উল্টোদিকেই নাকি। কিন্তু দেখিনি কখনো। ফলত কফিহাউসের সেই আড্ডাটা আমার কাছে একেবারেই সোনার পাথরবাটি। যখন আমার কলকাতানিবাসী বন্ধুরা আজব সব রেস্টুরেন্টের নাম বলে, এমনকি তারা কবে কোথায় ডিসকাউন্ট পেয়েছে বলে আমি হাঁ করে চেয়ে থাকি৷ তারচেয়েও অবাক হই কলকাতার লোকেরা কি এত বাসের নম্বর আর রুট মনে রাখে!

আমার ঠাঁই হল বিশ্বভারতীতে। ইচ্ছা ছিল আমার অন্য বন্ধুদের মতো ট্রেনে চড়ে কলেজ যাব। কিন্তু বহরমপুর আর বোলপুরের সরাসরি কোনো ট্রেন নেই। অগত্যা বাস। আমার আবার বাস বা গাড়িতে বমি করার একটা সমস্যা আছে। ফলে প্রথমদিকে বমির ওষুধ খেয়ে উঠে ঘুমাতাম। কনডাক্টর সিয়ানের কাছে মুখার্জীকাকু ডেকে দিত। পরের দিকে ওষুধের দরকার হত না। কীর্নাহার আসতে আসতেই উঠে পড়তাম। এসে দেখলাম বিশ্বভারতীতে আমার ব্যাচমেটদের বেশিরভাগই লোকাল। একদম শুরুর দুমাস আমি আর বহরমপুরের বন্ধু সায়ন চৌধুরী একসঙ্গে থাকতাম একটা মেসে। পরে নন্দন হোস্টেলে চলে আসি।

ডিপার্টমেন্টে দেখলাম কদিন পর থেকেই একজন দুজন করে ক্লাস আসা বন্ধ করে দিল। কেউ ডাক্তারি পড়তে, কেউ যাদবপুররে, বহরমপুরের সাবির ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে চলে গেল। পড়ে রইল মাত্র আঠাশ জন। শেষে সেকেন্ড ইয়ারের গোড়ায় দীপ্তেন্দু গেল এয়ারফোর্স। সাতাশ জন থেকে গেল।

সামঞ্জস্য ছিল ব্যাচে। আদ্দেক মেয়ে আদ্দেক ছেলে৷ সৃজনের নেতৃত্বদানের ক্ষমতা আছে কিনা জানি না কিন্তু বন্ধুবৎসল সোজাসাপটা মানুষ হওয়ায় আর বিপুল সংখ্যক বন্ধু থাকায় ও ছিল একরকম নেতা। আবার ক্লাসের অঘোষিত মাথা ছিল অঙ্কিতা দাস আর শ্রেয়সী চৌধুরী। এরা দুজনেই যথাক্রমে অধ্যাপক অসীম কুমার দাস ও অধ্যাপক প্রাণেশ চৌধুরীর কন্যা৷ জানি না কেন অঙ্কিতা ও শ্রেয়সীর মধ্যে একটা রেষারেষি ছিল। বোঝা যেত। পরীক্ষার সময় শ্রেয়সী আর আমি পাশাপাশি থাকায় অনেক সাহায্য দেওয়া নেওয়া হয়েছে। আমি সৃজন আর অঙ্কিতা একই জায়গায় অঙ্ক করতাম। সেখানকার বদমায়েশিগুলো আর লিখলাম না।

ক্লাসে সবচেয়ে অদ্ভুত লাগত ত্রিশালাকে। ত্রিশালা ইয়ংজন (বা ইয়ংজং বা ইয়নজন, আজও জানি না) ছিল কালিম্পঙের মেয়ে। সে আবার বাংলা বোঝে না। একদিন ক্লাসে কান্নাকাটি করতে লাগল ওর কোনো বন্ধু নেই, ওর সঙ্গে কেউ ইংরেজিতে কেন কথা বলে না। তাই নিয়ে একদিন ক্লাস তোলপাড়। আমি তখনও ভুলভাল ইংরেজি বলতাম। তাতেই ঝামেলা করলাম বাংলায় বাংলা জানা জরুরি বলে। অবশ্য পুচকে অঙ্কিতা মন্ডলের ঝরঝরে ইংরেজি, ঝগরুটে মৌলি, শ্রী ঋষিকৃপা মাভৈদেবের অশ্রাব্য হিন্দি ইংরেজির দাপটে ত্রিশালা চুপ মেরে গেল। পরে ত্রিশালা বাংলা তো শিখেই ছিলই, ভালো বলতেও পারত। মৌলিকে ঝগরুটে বলা অবশ্য ভুল। ও হল ঝগড়াশ্রী। অঙ্কিতা মন্ডল এইটুকু একটা মেয়ে। আমরা ডাকি পুচকি বলে। সারাজীবনে আমি সব খাওয়া ভুলে যাব কিন্তু ওর দিদির বিয়ের খাওয়া কখনো ভুলব না। সঞ্চিতার বাবার মিষ্টির দোকান ছিল বলে পাঁঁচবছর ধারণা করে গেছি। তেমনি কি রোমিতার গোছানো প্র‍্যাকটিকাল ভোলা যাবে? বাপরে!

ক্লাসে আমার নাম ছিল মোটা কারণ গোটা ক্লাসে আমি ছিলাম কলেবরে বৃহত্তম। সুমনের নাম হল বাবাজী। সৌম্যদীপ মন্ডলের নাম পুচু। লাড়ু তো চিরকালই স্যার সুদীপ লাড়ু। হোস্টেলে বাণী দিত। বাণী অর্থে বাণীই। সামনে নাই পেছন নাই যেকোনো বিষয় মানে মোদী বিজেপি বামপন্থা থেকে ক্রিকেট বা গিটার বা র‍্যানডাম ছেলেমেয়ে সম্পর্কে কমেন্ট। আমরা বলতাম লাড়ুসিদ্ধান্ত। ওর বাণী সংকলন করলে বোধহয় জাবদা একটা বই হত। ওকে নিয়ে বেশি না বলাই ভালো। এসব পড়লে আমাকে গাল দেবে বোধহয়।
চন্দন ছিল লাড়ুর একনিষ্ঠ বন্ধু। অরগ্যানিক পড়ে পড়ে লাড়ু আর চন্দনের নামটাই হয়ে গেল অরগ্যানিক লাড়ু আর অরগ্যানিক চন্দন। শেষমেশ চন্দন দেবলীনার প্রেমে কদিন হাবুডুবুও খেল। দেবলীনা আচ্ছা সুবিধাবাদী। শুরুতে ঢং করত মেলা। পরে নূপুর মিত্রের মতোনই চুপচাপ হয়ে গেল। নূপুর কম কথাই বলে। যেদিন কথা বলত সেদিন ক্লাসে হাততালি দিত সবাই। ব্যাপারটা অবশ্যি আমি আর সৃজন ইনিশিয়েট করতাম। তবে দেবলীনার এই দেখেও চিনতে না পারা, সামনে থেকেও কথা না বলা এগুলো অভদ্রতা। তেমনি আগে চন্দ্রলেখাও নিজেকে কি একটা বড় হনু ভাবত। পরে সেসব আর ছিল না।

আমি শ্রীধর ঋষিকৃপা মাভৈদেব দাস সম্পর্কে লিখব না। কারণ তাহলে বই হয়ে যাবে। তিনি বাদ গেলেন। পরে কখনো লিখব। অনেক সময় লাগবে।

ভরত ভালো ছেলে। সব জায়গাতেই আছে অথচ কি জন্য যেন চুপচাপ, নির্লিপ্ত। ওর সব বন্ধু হোস্টেলে। আমি স্কলার হোস্টেলে আসার পরেও ভরত আসতো মাঝে মাঝে, শেষের দিকে কথা হত না তেমন। ছোটখাটো অর্ণব গনাই দেখতে ছিল চুপচাপ হাবাগোবা। কিন্তু তলায় তলায় রামমিচকে। শানিত বুদ্ধি, পড়াশোনা করত। শোনা যায় ক্যামেলিয়াকে নাকি ছক করত। করত কি? ক্যামেলিয়া যাকে নিয়ে সিনিয়রদের মধ্যে হুড়োহুড়ি পরে গিয়েছিল একসময়। আমি তো আজ অব্দি বুঝে উঠলাম না ও কেন এত বিখ্যাত৷ হ্যাঁ, ভিত্তিহীন আঁতলামোর জন্য হতে পারে৷ শৈল্পিক মন কিন্তু লজিকের বেলায় গোলমাল করত। এটা পড়লে আমাকে কথা শোনাবে গ্যারান্টি।
আর অভিষেক ছিল এক নম্বর অসহ্য ব্যক্তি। সব জায়গায় চিমটি কাটা কথা, কাউকে কখনো না খাওয়ানো ইত্যাদির জন্য আমরা সবাই অপছন্দ করতাম। সুমনাও কেমন কেমন। দেখে মনে হয় বড্ড জাজমেন্টাল। আড়চোখে তাকায় চারদিকে। একদিন কি জানি কিভাবে দুজনের মধ্যে হাল্কা সম্পর্ক গড়ে উঠল। ব্যাস। দুজনেই ক্যামন য্যানো মানুষ হয়ে গেল। হার-হারামির হাতবাক্অস অভিষেক ভালোমানুষ ছেলে হয়ে গেল। ও আজকাল গিটারটা ভালোই বাজায়৷ বেচারা শুভাশীষই মাঝখান ব্যাক পেয়ে ইয়ারলস করল।

রাজেশ হল সানগ্লাস গাই। মোটামুটি শ্রীনিকেতন এলাকা নাকি ওর পকেটে। ওর এক ডাকে পঞ্চাশজন ছেলে চলে আসবে। শ্রীনিকেতনে সূর্য চন্দ্রও শুনেছি রাজেশের ডাকে ওঠে বা অস্ত যায়। দুর্ভাগ্যবশত আমাদের হোস্টেল ডিপার্টমেন্ট এসব শান্তিনিকেতন চত্বরে হওয়ায় রাজেশের দাপট আমরা কেউ কোনোদিন দেখিনি।

তনুশ্রীর নাম যে কে হাতিভাই দিয়েছিল জানি না৷ লিখতে বসে বেশ খানিক থেমে হাতিভাই এর নামটা মনে পড়ল৷ ঈশ্বর, আমায় ক্ষমা করো।

এমএসসিতে আসা নতুনদের মধ্যে কীর্তিমান আর অরিন্দম ভালোছেলে, এদের দুজনকে আমার খুব ভালো লাগে। বেশ বন্ধু বন্ধু। অরণ্য মানে ডিপার্টমেন্টের অরণ্য দ্রুত আমাদের সঙ্গে মিশে গেছিল। অচিন্ত্যও চুপচাপ কিন্তু পাকামিতে সবার আগে। তবে সবচেয়ে মজার অথচ রহস্যময় হল পিন্টু। মুর্শিদাবাদের ছেলে পিন্টু। পিন্টুর ইতিহাস পুরোটাই রহস্যে ঢাকা। সবটা বলত না আবার জানতে চাইলেও এড়িয়ে যেত। কেউ পিন্টুকে পুরোটা চেনেনি।
মেয়েদের মধ্যে কেয়া আর রিয়া ছিল বেশ। একজন খুব রোগা আর আরেকজন আমার মতোন৷ এদের দুজনে মাঝেমাঝেই ঝামেলা লাগত, যেটা অতিশয় উপভোগ্য। মহাদেব, রাজকমলের সঙ্গে খুব বেশি আলাপ হয়নি। অনির্বাণ রায়, রনিদের আমি হয়তো বেশিদিন মনে রাখতে পারব না৷ নতুন আসা বাকি মেয়েরা এতটাই মিতভাষী অথবা নাকউঁচু তাদের মনে রেখে লাভও নেই৷

মানস আর ঋত্বিকের জন্য শেষে গোটা একটা স্তবক হয়ে যায়। মানস ভালোমানুষ। সারাক্ষণ কোথায় ফ্রিতে ইন্টারনেট দিচ্ছে, কোন সিনেমা টরেন্টে দিয়েছে এসব খবর সবার আগে মানসের কাছে পাওয়া যেত। মাথাটা বোধহয় সোনাটোনা দিয়ে বাঁধানো ছিল। অঙ্ক, ফিজিক্স আর ফিজিক্যাল সায়েন্সে ওর মতো জ্ঞান আর সাউন্ড নলেজ আমি কোথাও দেখিনি৷ আমি ঠিক কতটা পড়লে বা খাটলে মানসের মতো হব জানি না৷
যদিও মানস ক্লাসের অন্যতম সেরা ছিল কিন্তু কেমিস্ট্রি সবচেয়ে ভালো বোঝে ও জানে ঋত্বিক কর। এ হল সেই ছোকরা যার ল্যাব পার্টনার হওয়ায় ফার্স্ট ইয়ারে এক্সপেরিমেন্টাল কেমিস্ট্রিতে আমার শূণ্য কর্তৃত্ব। কিচ্ছু শিখিনি৷ সবটাই নিজে করত আর আমাকে কিচ্ছু করতে দেয়নি। এত ভালো কেমিস্ট্রি জানে অথচ অহঙ্কার নেই।

এদের সঙ্গেই অপোগন্ড আমি পড়েছি। পাঁচ বছর। তাইতো বলি আমি কলকাতা দেখিনি, প্রণবদাকে দেখেছি। বিধানদার কাছে নিরীশ্বরবাদ শিখেছি। বিচিত্র সব আইডিয়োলজির লোকের সঙ্গে ক্লাস করেছি। কমন কোশ্চেনের আশায় টিচারদের অফিসে যাচ্ছে এমনও দেখেছি আবার "ইনঅরগ্যানিক পরীক্ষা? ধুর আমি তামিল পড়ব" বলা ছেলেও দেখেছি। সত্যিকারের নাটক কেমন হয় সেটা একজনকে প্র‍্যাকটিকাল চলাকালীন বারবার অসুস্থ হয়ে পড়তে দেখে বুঝেছি। আমাকে বাসের নম্বর মনে রাখতে হয় না। পোস্টাপিস মোড় থেকে সোজা শ্রীনিকেতন যেতে অর্মত্য সেনের বাড়ির সামনে ডিয়ার পার্কের রাস্তায় শিক্ষাভবনে আমার ডিপার্টমেন্ট। আমার পাঁচ বছর৷

Wednesday, 14 October 2020

নামহীন কবিতারা

চূড়ান্ত উন্নাসিক ভাবভঙ্গির প্রকাশ হল এভাবে না বেছে যা খুশি তাই লিখে ব্লগে দেওয়া। আমার চরিত্রবিরোধী কাজ। তবু নিজের কয়েকটা এখানে রেখে দিলাম। কেউ পড়লে ভালো। নইলে আঙুর টক। আর নামও পেলাম না যুতসই, তাই নামহীন কবিতারা। যদিও এদের কারো কারো নাম ছিল, আমি ছেঁটে দিয়েছি। 

অনেক ভুল আছে। অনেক এডিট করতে হবে। গঠনমূলক সমালোচনা করে চোখে আঙুল দিয়ে কেউ ভুল দেখিয়ে দিলে আনন্দ পাবো ও পরিবর্তন করব। 


১.

চারজন কবি বসে আছে

অন্ধকারে। গোল জটলা এক

নিমগ্ন কবিতাসৃষ্টিতে।

মাঝে লোহার কড়াই-এ জ্বলছে

আগুন।

কেউ বেলছে ছন্দের লেচি,

কেউ কুটছে অমিত্রাক্ষর,

তৃতীয়জন শানাচ্ছে শব্দচাকু।

অসীম আগ্রহে শেষজন 

বানাতে চেয়েছে কালজয়ী, 

অথচ সকলই তার বুদবুদ।


মধ্যিখানে হলুদ শিখা-

কাঠপোড়ার শব্দ মাধুর্যহীন। 

চারজন কবি কবিতায় মগ্ন।

কেবল ঝিঁঝি ডাকে একা


২.


 অনেকটা লম্বা হয়ে গেছি। 

মাথার চাঁদি মেঘ ছোঁয় ছোঁয়।

ছাদে দাঁড়ালে কাঁধে বক এসে বসে,

সূর্যাস্ত দেখতে আর গঙ্গার ঘাটে যেতে হয় না। 

নীচে অজস্র হাঁটুর সমান মানুষ। 

ঘাসের জঙ্গলে পা ফেললে যেমন 

চোরকাঁটা বাঁধে,

বাঁকা চোখ পথচারীরা আমার

পায়ে তেমনি ছুঁচ ফুটিয়ে যায়। 

আমার পাজামা রক্তে ভিজে যাচ্ছে! 

আগে আগে গর্ব হোত,

বাসের ছাদ থেকে নিমেষে 

সুটকেস পেড়ে আনতাম

আর নারকেল গাছ দেখে ডাব। 

ভোরবেলা ঢ্যাঙা পা ফেলে 

দেখে এসেছি কাকের বাসায় কোকিলের ডিম।

তারপর আরো কত হাত বেড়ে গেছি। 

এখন মাথায় লালবাতি জ্বালিয়ে রাখি,

দেখি উড়োজাহাজ গতি বদলাচ্ছে আমায় বাঁচাতে।

কিন্তু আর ভালো লাগে না। 

আমার পাজামা রক্তে ভিজে যাচ্ছে!

দূর থেকে হাওড়া ব্রিজটা

চোখে পড়ে। 

দিগন্ত আমায় ধোঁকা দিয়েছে,

রাতেও ঘুম আসে না।

তখন গাড়ির আলো দেখি, ট্রেন, উল্কাপাত,

কুকুরের চিৎকার, সঙ্গম, অনন্ত ঘুম। 

কানে ঠান্ডা লাগে।

কিন্তু ভালো লাগে না। 

ঝিমধরা আলোয় গুড়ি মেরে

আবার পায়ে পায়ে ছুঁচ বিঁধে যায়,

সে নাবালক নাকি বেশ্যা? 

আমি হতাশ হয়ে পড়ছি।

কই আর তো শুঁয়োপোকা দেখতে পাই না!

পিপীলিকা সারি বহুদিন অদৃশ্য হয়ে গেছে।

আমি নিজেই এখন বহুতল।

আর কত লম্বা হব?

পা টলছে, আঙুলের ফাঁকে ফাঁকে 

চাপ রক্ত জমে, হাঁটুতে ব্যথা।

আমি লম্বা হচ্ছি।

আরো অপ্রয়োজনীয় হচ্ছি। 


৩.


একদিন সমুদ্রের পাড়ে দুহাত ছড়িয়ে দাঁড়াব।

দমকা হাওয়ায় বুকখোলা জামা 

উড়বে পতপত করে। 

পায়ের কাছে ঢেউ ভাঙবে

যেমন ভেঙে চলেছে গত লক্ষ বছর ধরে।

শেষবারের মতো

আমি একবার বুকভরে শ্বাস নিতে চাই। 

তারপর 

নাক দিয়ে, মুখ দিয়ে 

বাইরে আসবে সারা জীবনের জমানো 

নীল ধোঁয়া, সাজানো আর্তনাদ,

বেদানা রঙের কবিতারা।

একটা কালো বিন্দু দিগন্তে দেখা দিল,

ধীরপায়ে এগিয়ে আসছে আমার দিকে;

আমাকে হয়তো গ্রাস করে নেবে কিছুক্ষণে।

পেটের অন্ত্র-নাড়ি, অন্ন নিংড়ানো পাকস্থলী 

সাপের মতোন বেরিয়ে আসবে

মুখ দিয়ে,

এঁকেবেঁকে নেমে যাবে সমুদ্রে।

পেছনে তার মস্ত শহর, দেওয়াল-বাড়ি

পিচগলা রাস্তা, ইঁটখসা পাঁচির স্তূপীকৃত। 

আমি তখনও ধ্যানমগ্ন;

হাওয়ায় কাঁপে চুল, কানের লতি


৪.

শাপলা কচুরিপানা গেঁড়ি আর গুগলির ঢল।

মাঝখানে সন্ন্যাসী বক বসে দেখে

জল আর জল। 


৫.

তোমার জন্য শয়তানও লেখে কাব্য।

তবে বাজিয়ে বাঁশরী আমার কি দোষ হল? 


৬. 

দুষ্টু মেয়ে মিষ্টি হাসে বিষ্টি নামে তাতে

ভিজব বলে ছুট্টে গেছি একলা খোলা ছাতে

ছাত ভিজেছে ভিজছি আমি জ্বর না আসে পরে

কার হাসিতে ডুবতে গিয়ে মন উড়েছে ঝড়ে


৭. 

জ্ঞান আমাকে গারদে ভরে।

শুধু হলদে ফুলের নাম জানি না

বলে থমকে দাঁড়াই।


৮.

চড়াই বলে তাচ্ছিল্য করায়

প্রতিদিন ধানক্ষেতে ডুবে মরি। 


৯.

আকাশ একটা পাঁচির

যা মাটি আর শুকতারাকে 

আলাদা করেছে।


১০.

অনুভূতির অস্ত্রাগারকে

প্রেমিকা বলে। 


১১.

সকল চিন্তার কারণ

চিন্তা কিভাবে

শেষ হবে। 


১২. 

এমন সময় এলো

যখন কবিতারা সব স্লোগান হয়ে গেছে। 

একটু আগের প্রেমের ছন্দ লেখা কবি

মিছিলের অগ্রভাগে;

নাকউঁচু ছেলে, সিরিয়াল দেখা কাকু,

অফিসফেরত কেরানী, বইপোকা মেয়ে, বড়মাসি

গাইছে, হাঁটছে - প্রতিবাদে চিৎকার করছে। 


রাস্তার বাঁকের নিরক্ষরও বুঝে গেছে

কিছু একটা চলছে চারপাশে।

আড়চোখে ফিসফাস! 

কারা জানি রাতারাতি পোস্টার ফেলেছে

এদেশ নাকি তাদের। 

মানে কি এতদিন ছিল না?

নাকি কেউ ছিনিয়ে নিতে এল জুড়িগাড়ি চেপে?


প্রশ্ন উঠেছে। তাই

নরম মাংসের মানুষেরা মোড়ে মোড়ে জোট বাঁধছে।

হাতে বড় বড় প্ল্যাকার্ড।

হাড় শক্ত করছে। 

কিসের একটা ঝড় চলছে আর

সবাই শিল্পী হয়ে গেছে! 

এমন কি দেখেছিল কেউ? আগে কখনো? 


আনাড়ি লেখক কি একটা লিখেছিল চুপিচুপি। 

প্রেমিকাও জানত না। 

এমন সময় এলো

সে লেখা লোকে পড়ছে, বিস্মিত হচ্ছে, 

রাগে ফেটে পড়ছে দমচাপা আগ্নেয়গিরির মতো৷ 


দেশ কারা যেন লুঠ করতে চায়।

কারা তারা? আশেপাশের ঘাপটি মারা হার্মাদ?

ঝাঁপিয়ে পরে অসহায় গেরস্তের পরিচয় 

লুঠে নেয় তারা।

লাঠি মারে, ভেঙে ফেলে সাধের লন্ঠন। 


চারপাশে ঢাক বাজছে৷ 

ঢোল-কর্তাল, বড় বড় কাঁসর। 

লোকজন রাস্তায় হাঁটছে, ওপাশে দানবশ্রেষ্ঠ! 

এদিকে

তোমার ছোঁয়ায় আমার কবিতারা স্লোগান হয়ে গেছে। 


১৩.

দুঃখের কোনো ভয় নেই,

নিরাপত্তা লাগে না। 

তার মা নেই,

বাবা নেই,

প্রেমিকা নেই,

বন্ধু নেই,

ভাইবোন নেই,

টাকা নেই। 

দুঃখের কেবল হাতভরা শূন্যতা

আর কোলভরা আকাশ আছে৷ 


যত ব্যস্ততা আনন্দের।

যত পাইক বরকন্দাজ আনন্দকে ঘিরে৷ 

হিংসে হয় না তার? 

নাকি সোনা সাঁতলানো হাত কখনোই 

আদতে একাকিত্ব চায়নি?


১৪.

বৃষ্টি পরলে পৃথিবীটা কাদা হয়ে যায়

আর সব মানুষ কইমাছ সাজে। 

জোরে নিশ্বাস নেয়, 

উঠতে চায় তালগাছে। 

আমিও এবারের বর্ষায় কইমাছ সেজেছি

কিন্তু ফেঁসে গেছি সুগভীর পাঁকে৷ 

আজকাল কানের ফুটোতে দলা দলা কাদা এসে 

দেওয়াল বানায়,

কানকোর বিষম ব্যথা আমাকে ফুসফুস চেনাচ্ছে,

বাতাস চেনাচ্ছে। 

আমি মাছ হয়ে গেছি 

শুধু বর্ষার জল নেই। 

সব জল আয়ত দিঘীর মতো কারো

চোখে লেগে আছে। 


১৫.

নিজেকে একা একা মনে হলে 

গাছের গুঁড়ি জড়িয়ে ধরি, 

একটা অদ্ভুত আনন্দ হয়, যেন 

কোনো পুরোনো দাদুকে জড়িয়ে ধরে 

সোনার গণেশের গল্প শুনছি। 

ডালগুলো নেমে নেমে আসে, 

পাতাগুলো মাথায় হাত বুলিয়ে যায়। 

রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে 

সামনে বটগাছ পড়লে পা উঁচু করে 

মাথায় ঝুরি ঠেকিয়ে নিই।


আমি যেখানে থাকি

তার আসেপাশে অনেক অমলতাস৷ 

তাদের ফেলে দেওয়া বাঁদরলাঠিগুলো

তুলে ছুঁড়ে দিই এপাশ ওপাশ৷ 

মনে হয় পাঁচিরঘেরা সভ্য সমাজে 

অদৃশ্য হরিণ শিকার করি,  

অথচ লক্ষ্যভ্রষ্ট হচ্ছি প্রতিবার। 


গাছেদের ভাষার 

একটা দুটো শব্দও শিখেছি। 

বর্ষায় বৃষ্টি থেমে গেলে 

বুড়ো গাছগুলো কাঁদে৷ 

এখন সেসব বুঝতে পারি। 


কিন্তু ফুল ছেঁড়ার ব্যথাটা 

এখনো মাথায় ঢোকেনি। 


১৬.

অমন সহজ করে হাসি আমার ভীষণ কঠিন লাগে। 

বিজ্ঞানের বই খুঁজে যার কোনো অর্থ পাই না, 

অথচ রবীন্দ্রনাথ উলটানোর 

ধৈর্য আমার নেই। 

জানো, আমি তোমার মতোন হাসতে পারি না,

আমি তোমার মতোন করে কাঁদতেও 

পারি না৷ 


এখানে হাসলে লোকে আড়চোখে তাকায়,

কাঁদলে আড়ালে হাসে, ভাবে কাপুরুষ।

এদেশে ফুল ফোটারও অর্থ আছে,

এদেশে তারা খসাকে বলে উল্কাপাত, 

এদেশে রাতের আকাশ দেখে কেউ বলে না, সূর্য কোথায় পালালো?

বিশ্বাস করো, আমি এ যুক্তির ঝোলা বইতে পারছি না। 

কালকে  শুনলাম প্রেমের কারণ নাকি হরমোন। 

সম্মতি জানিয়েছি কারণ নইলে লোকে বলবে আমি কুসংস্কারাচ্ছন্ন। 


আজ এই এতকিছুর মধ্যেও তুমি হেসে দিলে।

কতকটা বিষ গ্যাসের মতো সে হাসির গন্ধ আমার ফুসফুস জ্বালিয়ে দিয়ে গেল।

আমি বিভোর হয়ে গেলাম,

আমি কবি হয়ে গেলাম৷ 



১৭.

আমাকে আঁকবে বলে অগ্রিম নিয়েছিল

রতনপল্লীর অরণ্য। 

বলেছিল এঁকে দেব ভাই, অনেকটা ঠিক তোমার মতো। 

তারপর সাড়ে তেরোদিন ধরে ভাড়াবাড়ির নোংরা একটা ঘরে বসেছিলাম আকাঠা হয়ে। 

নড়ে গেলে

ভেস্তে যেত খেলা। 

চুন খসা ঘরে উত্তরের গোলাপ আলোয়

আমি নিজেকে ভাবতাম গার্টুড স্টাইন

আর সামনে কলাভবনের পিকাসো। 

তারপর একদিন আঁকা শেষ হল, 

আর ওমনি অরণ্য তড়িঘড়ি সাদা কাপড়ে ঢেকে দিল ক্যানভাসটা। 

আমি বললাম কি হে। আঁকলে কেমন!

দেখি সে চুপ করে দাঁড়িয়ে। ভাবলাম ওর বুঝি অমন কুসংস্কার।

আবার খোঁচা দিলাম, কই? ছবিখানা দেখাও!

শিল্পী কোনো রূপকথার জাদু অথবা খাবারের ঢাকনা তোলার মত করে উন্মোচন করল ছবিটা।  

কিন্তু দেখি ক্যানভাসটা একেবারে বেগুনি। মাঝে দুটো সাদা আঁচড় মাত্র।  

তাতে যে আমি নেই সেটা অন্ধেও বোঝে। অথচ ভীষণ উত্তেজনায় বাইরে দৌড়ে চলে এলাম। 

না।

এরপর অরণ্যর সঙ্গে আমার সাক্ষাৎ হয়নি। চেষ্টাও করিনি। 

কারণ এখন জানি ছবিতে আমি অথবা আমরা ছিলাম। 


১৮.

পৃথিবীর সমস্ত দুঃখ অথবা আনন্দই একরকম। 

আমার পছন্দের কলম হারানোর সঙ্গে 

মাতৃশোকের তুলনা হয়তো সম্ভব। 

কিন্তু তফাত

কেবল তীব্রতায়। 

প্রেমিকার সঙ্গে বাদানুবাদে অনুশোচনা, 

চাকরি পাওয়ার আনন্দ,

কখনো চাকরি হারানো আর অঙ্কে শূণ্য পাওয়ার 

তফাত আঙুর আর কিসমিসের। 

সন্তান প্রথম কথা বললঃ এর সঙ্গে 

আমার আঁকা ছবির প্রদর্শনীর 

মূলগত কোনো পার্থক্য নেই। 

পৃথিবীতে সুখের দাম কম, আর 

পৃথিবীর প্রায় সমস্ত দুঃখ একরকম। 

শুধু সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়ে 

দিগন্ত দেখতে পেয়েও তাকে

না ছুঁয়ে ফেরত আসাটা আলাদা


১৯.

পাখিরা এমনি ডাকে রোজ রোজ।

আমি অংক কষি

কোন পাখি কেমন ডাকে,

কত ইউনিট উচ্ছ্বাস আর

কত ইউনিট ব্যস্ততা।

কিন্তু বিজ্ঞান ভুলে যাই।


সকালবেলাটা নতুন রঙ করা দেওয়ালের মতো।

প্রতিটা সকালেই একটা

ঘাস ঘাস গন্ধ থাকে। 

নরম একটা ভাব, 

ঠান্ডা ভিজে একটা অনুভূতি।

আমি বিজ্ঞান মানতে খুব ভুলে যাই,

তাই দুই শালিক খুঁজি।


পাখিদের ব্যস্ততার একক

বইএ লেখা থাকে না।

নেই উচ্ছ্বাস মাপার হিসেবও। 

তাই হিসেব মেলাতে চাই, আমার

আর পোলে বসা

কাকের উচ্ছ্বাস অনুরণিত

হচ্ছে কিনা।

ভুল হয়।

ভুল হয়।

কখনো ভুলের হিসেবও

ভুল করে বসি।


এই অঙ্ক বড় কঠিন।

সকালের ওজন মাপার চেয়েও কঠিন।


২০.

এমন কিছু দুঃখ আছে, 

যে দুঃখটা কেবল আমার 

কারোর তাতে ভাগ হবে না।

সে দুঃখকে বইলে জানি 

কষ্ট বাড়ে। ক্লিষ্ট হয়ে

গুম হয়ে মেরে যাই ধুসর রঙে।

সেই ধুসরে আগাছা হয়,

সেই ধুসরে পুকুরপাড়ে

মাছরাঙা রোজ শিকার খোঁজে।

কচুপাতায় জলের ফোঁটা

গোল হয়ে যায়, 

যেমন নিটোল তোমার জীবন।

বুঝলে? তোমার এ দুঃখতে

শোক হবে না, রাগ হবে না। 

একটুকু তাই ভাগ হবে না।

এদুঃখটা কেবল আমার,

নীরব ঘরে একলা বসে

গল্প আঁকার দুঃখ এটা।


২১.

জ্যামিতির নিয়মে দুটো তল পরস্পরের ওপর একে অন্যকে ছেদ করলে একটা রেখা তৈরি হয়। অথবা ধরুন, ফাঁকা একখানা কাগজ, তাতে হাতধরাধরি করে অনেক বিন্দু; আপনি আসলে সেই রেখাগুলো পড়ছেন। কবিতা তো মাথায় তৈরি হল। আসলে আমাদের মাথায় অর্বুদ রেখা জমে আছে। একটা খবরে কাগজ পড়লে রেখায় রেখায় জুড়ে মন তাই বিশ্ব ঘুরে নেয়। নেপালের ভূমিকম্পে চিড় ধরল দার্জিলিঙের দেওয়ালে। এভাবেও রেখার জন্ম হয়।  কিন্তু যদি আমি দুটো রেখাকে নিয়ে কাটাকুটি খেলি আমার সামনে এবার একটা বিন্দু জন্ম নেবে। 

 আবার ধরুন একটা চৌকো বাক্স নিলাম। সেটা দশ হাত দূরে একটা বাক্সই থাকবে। কিন্তু দেড়শো হাত দূরে একটা তল তৈরি হবে। যেমন আকাশের চাঁদ আসলে একটা চকচকে থালা। আবার সেই বাক্সকে হাজার হাত দূরে রাখলে তল হয়ে যাবে বিন্দু। তখন বিন্দু বিন্দু পাশাপাশি বসিয়ে বানাতে পারব দিগন্তরেখা। 

আমি অবাক হই, আজকাল কাঁটাতারের বেড়া দিয়েও মানচিত্রে রেখার জন্ম হয়।  


২২.

বৃত্ত শান্তির প্রতীক।

একথা যেদিন শুনলাম

মনে হল কানের কাছের

যানজট, শব্দবিষ নিমেষে 

চৌকো হয়ে গেল। 

সাইকেল ঘন্টি রুমাল-বেড়ালের ফাঁদে

রূপ নিল রম্বসের। 

পাখির ডাকঃ কোকিল-দোয়েল

বর্গক্ষেত্রের মতো। 

কাকের ডাক ত্রিভুজ ত্রিভুজ৷ 

কিছু শব্দ চেনা, কয়েকটা বুঝলাম না। 

সেগুলো আঁকাবাঁকা রেখা হয়ে

পূব থেকে উত্তরে ধেয়ে গেছে। 

এই যে হকারের ডাক,

যখা টক কমলা বেচতে বেরিয়েছে,

ওটা ঘনক। 

মেঘমল্লার শুনলাম, সেইটা আবার 

শঙ্কুর মতো। 

সমুদ্রগর্জন শুনে

মনে হচ্ছে মাটি থেকে আকাশ অব্দি

লম্বা একটা পাইপ উঠে গেছে। 

সমস্ত শব্দ অজস্র জ্যামিতিক আকারে

ছেঁকে ধরছে আমাকে।

আমি কি বিকারগ্রস্ত? 

আমি কি কালো জলে ডুব দিয়ে 

আত্মবলি দেব? 

প্রান্তহীন অস্থিরতায় 

আমি দেরাজের আকৃতিতে চিৎকার করে উঠছি।

আমার একটা বৃত্ত চাই,

অসীম জ্যামিতিক নকশায় 

একটুকরো বৃত্ত। মায়ের গলার মতো।


২৩.

অনন্ত মরুভূমিতে 

শুয়ে আছে দুইখানি পা,

কোমর থেকে বাকিটুকু নেই।

শুকোচ্ছে রস তাই

শকুনির নেই আর মোহ।

পরে আছে তার দুইখানি পা

যে প্রেমিকার দিকে

হেঁটে যেতে চেয়েছিল। 


২৪.

এরচেয়ে বীজানু হয়ে গেলে ভালো।

তাই আর একের চিন্তা 

করতে হবে না তোমায়,

আকাশে বাতাসে ছেয়ে থাকব

লক্ষ শিশু নিয়ে। 

ভাবো তো, আমার জন্য

এক পৃথিবী মানুষ ঘরবন্দী হবে!

তখন তুমি আর আমি 

হাত-ধরাধরি করে 

বসব বড়রাস্তার মোড়ে।


২৫.

অফুরান হরিণের বনে

প্রতি বাঘই

দার্শনিক। 


২৬.

একটা গম 

একটু পরেই রুটি হয়ে যাবে। 

একটা রুটি

একটু পরেই আমি হয়ে যাব। 

আমাকে কবিতাখানা 

তাড়াতাড়ি শেষ করতে হবে- 

নইলে না জানি কখন 

সমুদ্র হয়ে যেতে পারি। 


২৭.


প্রতি বছর

নিজের মৃত্যুদিন কাটিয়ে ফেলি 

ভাত-ডাল খেয়ে। 

কখনো সন্দেহ হয় না-

দেড়, তেত্রিশ বা চুয়াত্তর বছর পর

বিছানায় শুয়ে

সেকেন্ড গুনব কিনা। 

মৃত্যু ব্যাপারটাই এমন!

একটা কালো বিন্দু

কপালের কাছে

ক্রমশ বড়ো হয়ে গিলতে আসবে,

ক্লান্ত কৃষক চাষাবাদ বন্ধ করে

তুলে রাখবে লাঙল।

দেখব,

বসন্তের পর 

চড়ুই এর শূন্য বাসায়

ভাঙা ডিমের খোলা পরে আছে। 


২৮. 

পৃথিবী একলা

দ্বীপের মতোন।

সেখানে একটি ছেলে

এবং একটি মেয়ে।

বাকিরা গাছপালা।